মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য Madhyamik 2023 History Question Paper Solved PDF এখন সহজলভ্য, যা আপনাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। প্রতি বছর মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বোর্ড কোন ধরনের প্রশ্ন বেশি জিজ্ঞাসা করে এবং কোন টপিকগুলো থেকে নম্বর বরাদ্দ থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই ২০২৩ সালের মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ (Madhyamik History Solved Question Paper) সংগ্রহ করে অনুশীলন করলে আসন্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
এই পোস্টে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আপনি বিনামূল্যে Madhyamik 2023 History Question Paper Solved PDF Download করতে পারবেন, এবং কেন পুরনো প্রশ্নপত্র সমাধান করা মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্ট্র্যাটেজি। WBBSE (পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ) প্রতি বছর যে প্যাটার্নে প্রশ্ন করে, তার সাথে পরিচিত হওয়াই ভালো নম্বর পাওয়ার প্রথম ধাপ — আর এই ২০২৩ সালের সমাধানকৃত প্রশ্নপত্রটি ঠিক সেই কাজেই আপনাদের সাহায্য করবে।
Madhyamik 2023 History Question Paper Solution PDF Download | মাধ্যমিক ২০২৩ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমস্ত উত্তর
বিভাগ-ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো: (১×২০=২০)
১.১ র্যাচেল কারসন যুক্ত ছিলেন —
(ক) আঞ্চলিক ইতিহাসে
(খ) নারীর ইতিহাসে
(গ) পরিবেশের ইতিহাসে
(ঘ) শহরের ইতিহাসে
উত্তর: (গ) পরিবেশের ইতিহাসে
১.২ বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন —
(ক) তিন বছর
(খ) চার বছর
(গ) দশ বছর
(ঘ) বারো বছর
উত্তর: (খ) চার বছর
১.৩ রামমোহন রায় অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন —
(ক) ১৮২১ খ্রি.
(খ) ১৮২৩ খ্রি.
(গ) ১৮১৫ খ্রি.
(ঘ) ১৮২৬ খ্রি
উত্তর: (গ) ১৮১৫ খ্রি.
১.৪ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি প্রাপক ছিলেন —
(ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(খ) বিদ্যাসাগর
(গ) আনন্দমোহন বসু
(ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (ঘ) আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
১.৫ ‘রেনেসাঁস’ শব্দটি হল একটি —
(ক) ইংরেজি শব্দ
(খ) ফরাসি শব্দ
(গ) ইতালীয় শব্দ
(ঘ) লাতিন শব্দ
উত্তর: (খ) ফরাসি শব্দ
১.৬ ‘জঙ্গলমহল’ নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করা হয়েছিল —
(ক) সাঁওতাল বিদ্রোহের পরে
(খ) কোল বিদ্রোহের পরে
(গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে
(ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহের পরে
উত্তর: (গ) চুয়াড় বিদ্রোহের পরে
১.৭ ভারতের রাজকীয় বনবিভাগের প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন —
(ক) জোহান ক্রুগার
(খ) এলিয়াস ফিসার
(গ) ডেইট্রিক ব্রানডিস
(ঘ) ফ্রেডারিক হফম্যান
উত্তর: (গ) ডেইট্রিক ব্রানডিস
১.৮ মহাবিদ্রোহকে (১৮৫৭) যে ব্রিটিশ লেখক ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন —
(ক) চার্লস রেকস্
(খ) নর্টন
(গ) ম্যালেসন
(ঘ) ডিসরেলি
উত্তর: (ক) চার্লস রেকস্
১.৯ চৈত্রমেলা, ‘হিন্দুমেলা’ রূপে পরিচিত হয় —
(ক) ১৮৬৭ খ্রি থেকে
(খ) ১৮৭০ খ্রি থেকে
(গ) ১৮৭২ খ্রি থেকে
(ঘ) ১৮৭৫ খ্রি থেকে
উত্তর: (ক) ১৮৬৭ খ্রি থেকে
১.১০ ভারতসভার প্রথম সভাপতি ছিলেন —
(ক) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
(খ) আনন্দমোহন বসু
(গ) রেভা: কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) শিবনাথ শাস্ত্রী
উত্তর: (গ) রেভা: কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
১.১১ বাংলা পুস্তক ব্যবসায়ের পথিকৃৎ ছিলেন —
(ক) উইলিয়ম কেরি
(খ) রামমোহন রায়
(গ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
(ঘ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
উত্তর: (ঘ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
১.১২ বাংলা লাইনোটাইপ প্রবর্তিত হয় —
(ক) ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে
(খ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে
(ঘ) ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে
উত্তর: (ঘ) ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে
১.১৩ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন —
(ক) অশ্বিনীকুমার দত্ত
(খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত
(গ) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
১.১৪ ভারতের প্রথম শ্রমিক সংগঠন ছিল —
(ক) গিরনি কামগড় ইউনিয়ন
(খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
(গ) ইন্ডিয়ান মিল হ্যান্ডস ইউনিয়ন
(ঘ) সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস
উত্তর: (খ) মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন
১.১৫ কৃষক-প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন —
(ক) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
(খ) প্রফুল্লচন্দ্র সেন
(গ) বাবা রামচন্দ্র
(ঘ) ফজলুল হক
উত্তর: (ঘ) ফজলুল হক
১.১৬ ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’ রচনা করেন —
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) রজনীকান্ত সেন
(ঘ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
উত্তর: (ঘ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
১.১৭ নারী কর্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন —
(ক) উর্মিলা দেবী
(খ) বাসন্তী দেবী
(গ) সরলাদেবী চৌধুরানি
(ঘ) সুনীতি দেবী
উত্তর: (ক) উর্মিলা দেবী
১.১৮ এজাভা সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা ছিলেন —
(ক) রামস্বামী নাইকার
(খ) ত্যাগরাজা চেট্টি
(গ) নারায়ণ গুরু
(ঘ) ভীমরাও আম্বেদকর
উত্তর: (গ) নারায়ণ গুরু
১.১৯ ভাষাভিত্তিক পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যটি গঠিত হয়েছিল —
(ক) ১৯৪৭ খ্রি
(খ) ১৯৫০ খ্রি
(গ) ১৯৫৩ খ্রি
(ঘ) ১৯৫৬ খ্রি
উত্তর: (গ) ১৯৫৩ খ্রি
১.২০ পুরুলিয়া জেলাটি পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয় —
(ক) ১৯৫০ খ্রি
(খ) ১৯৫২ খ্রি
(গ) ১৯৫৬ খ্রি
(ঘ) ১৯৬০ খ্রি
উত্তর: (গ) ১৯৫৬ খ্রি
বিভাগ-খ
২. যে-কোনো ষোলোটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে) (১×১৬=১৬)
উপবিভাগ ২.১
একটি বাক্যে উত্তর দাও: (১×৪=৪)
২.১.১ ভারতে কোন্ বছর রেলপথ প্রবর্তিত হয়?
উত্তর: ভারতে রেলপথ প্রবর্তিত হয় ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে।
২.১.২ গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটি কোথা থেকে প্রকাশিত হত?
উত্তর: গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত।
২.১.৩ বেঙ্গাল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট-এর প্রথম অধ্যক্ষ কে ছিলেন?
উত্তর: বেঙ্গাল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট-এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রমথনাথ বসু।
২.১.৪ ‘গান্ধিবুড়ি’ নামে কে পরিচিত ছিলেন।
উত্তর: ‘গান্ধিবুড়ি’ নামে মাতঙ্গিনী হাজরা পরিচিত ছিলেন।
উপবিভাগ ২.২
ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো: (১×৪=৪)
২.২.১ বিপিনচন্দ্র পালের জীবনীগ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।
উত্তর: ঠিক
২.২.২ প্রথম ভারতীয় শবব্যবচ্ছেদকারী ছিলেন মধুসূদন দত্ত।
উত্তর: ভুল
২.২.৩ ড. অনিল শীল আঠারো শতককে ‘সভাসমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।
উত্তর: ভুল
২.২.৪ গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন ব্যঙ্গচিত্র শিল্পী।
উত্তর: ভুল
উপবিভাগ ২.৩
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও: (১×৪=৪)
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ সিভি রমন | (১) সিন্ধুপ্রদেশ |
| ২.৩.২ বাবা রামচন্দ্র | (২) বোম্বাই |
| ২.৩.৩ উষাবেন মেহতা | (৩) কলকাতা |
| ২.৩.৪ হেমু কালানি | (৪) উত্তরপ্রদেশ |
উত্তর:
| ২.৩.১ সিভি রমন | (৩) কলকাতা |
| ২.৩.২ বাবা রামচন্দ্র | (৪) উত্তরপ্রদেশ |
| ২.৩.৩ উষাবেন মেহতা | (২) বোম্বাই |
| ২.৩.৪ হেমু কালানি | (১) সিন্ধুপ্রদেশ |
উপবিভাগ ২.৪
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত করো ও নাম লেখ: (১×৪=৪)
২.৪.১ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র – মিরাট
২.৪.২ সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫) এলাকা
২.৪.৩ বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের একটি কেন্দ্র – বারাসত
২.৪.৪ দেশীয় রাজ্য হায়দরাবাদ
উত্তর:

উপবিভাগ ২.৫
নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো: ১×৪=৪
২.৫.১ বিবৃতি: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন এবং এটি ব্রাহ্ম আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
ব্যাখ্যা ১: তিনি সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: তিনি খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাফল্যজনকভাবে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: তিনি ব্রাহ্মসমাজের সংস্কার করেন এবং নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সংস্কার করেন এবং নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন।
২.৫.২ বিবৃতি: ভারতের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিল।
ব্যাখ্যা ১: ব্রিটিশ সরকারের অরণ্য আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
ব্যাখ্যা ২: ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।
ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে অরণ্য সম্পদ ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
২.৫.৩ বিবৃতি গান্ধিজি কখনোই শ্রমজীবীদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি।
ব্যাখ্যা ১: গান্ধিজি ছিলেন মিল-মালিকশ্রেণির প্রতিনিধি।
ব্যাখ্যা ২: গান্ধিজি পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: গান্ধিজি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: গান্ধিজি পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছিলেন।
২.৫.৪ বিবৃতি: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মোপালা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কৃষকদের একটি জঙ্গি আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল শিল্প-শ্রমিকদের একটি অভ্যুত্থান।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কৃষকদের একটি জঙ্গি আন্দোলন।
বিভাগ-গ
৩. দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে কোনো এগারোটি): ২×১১=২২
৩.১ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই মোহনবাগান ক্লাব (অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী) আই.এফ.এ শিল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনালে ইংরেজদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট দলকে ২-১ গোলে পরাজিত করে, যা ছিল কোনো ভারতীয় দলের প্রথম আই.এফ.এ শিল্ড জয়। খালি পায়ে বুট পরা ইংরেজ দলকে হারানোর এই ঘটনা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মানসিক জয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবোধ জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩.২ ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সরকারি নথিপত্র বলতে বোঝায় সরকার বা প্রশাসনিক দপ্তর কর্তৃক প্রস্তুত ও সংরক্ষিত বিভিন্ন সরকারি নথি, যেমন — চিঠিপত্র, প্রতিবেদন, আইন, বিধিনিয়ম, জনগণনা রিপোর্ট, বিচার বিভাগীয় নথি, রাজস্ব সংক্রান্ত নথি ইত্যাদি। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এই নথিপত্রগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি থেকে সমকালীন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
যেমন — ন্যাশনাল আর্কাইভস অফ ইন্ডিয়া, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট আর্কাইভস প্রভৃতিতে সংরক্ষিত সরকারি নথিপত্র ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
৩.৩ কাদম্বিনী (বসু) গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণীয় কেন?
উত্তর: কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায় ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রমুখী বসুর সাথে যুগ্মভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে ভারত তথা সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা স্নাতক হন। এরপর তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি লাভ করে ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে গিয়ে আরও উচ্চতর চিকিৎসা ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ভাষণদানকারী প্রথম মহিলা হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয়।
৩.৪ কোম্পানির শিক্ষাক্ষেত্রে ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে টমাস ব্যাবিংটন মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষানীতি অনুযায়ী সমাজের উচ্চবর্গ ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার করা হবে, আর তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তা সমাজের নিম্নস্তরে চুঁইয়ে পড়বে বলে মনে করা হয়েছিল। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘ডাউনওয়ার্ড ফিল্ট্রেশন থিওরি’, যার লক্ষ্য ছিল অল্প খরচে এমন একদল ভারতীয় তৈরি করা যারা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় কিন্তু রুচি, নীতি ও বুদ্ধিতে ইংরেজ হবে।
৩.৫ দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি কেন গড়ে তোলা হয়েছিল?
উত্তর: কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২) দমনের পর বিদ্রোহ কবলিত ছোটোনাগপুর অঞ্চলে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে “দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি” (South-West Frontier Agency) গঠন করে, যার সদর দপ্তর ছিল চাইবাসায়। এই এজেন্সির মাধ্যমে কোল উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলকে সাধারণ ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার আওতা থেকে বাইরে রেখে একজন এজেন্টের অধীনে ন্যস্ত করা হয়, যেখানে জটিল ব্রিটিশ আইন-কানুনের পরিবর্তে কোলদের নিজস্ব সরল প্রথাগত আইন অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালিত হত।
৩.৬ ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ কী?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার একটি সীমিত অঞ্চলে আবদ্ধ ছিল বলে এটি সর্বভারতীয় রূপ নিতে পারেনি। দুদু মিয়াঁর মৃত্যুর (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) পর আন্দোলনের নেতৃত্বে ভাটা পড়ে এবং তাঁর উত্তরসূরিরা পূর্বসূরির মতো দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হন। এছাড়া সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় হিন্দু কৃষকসমাজ এই আন্দোলনে সামিল হয়নি, ফলে ব্রিটিশ সরকার, নীলকর ও জমিদারদের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে ব্যর্থ হতে হয়।
৩.৭ মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর এলাহাবাদের দরবারে লর্ড ক্যানিং কর্তৃক ঘোষিত মহারানির ঘোষণাপত্রে ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, দেশীয় রাজন্যবর্গের অধিকার স্বীকার ও ভারতীয়দের প্রশাসনিক পদে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহ-পরবর্তী ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় ও স্থায়ী করা। ফলে এই প্রতিশ্রুতিগুলি কার্যক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতারণা হিসেবেই থেকে যায় এবং ভারতীয়রা প্রকৃত অর্থে কোনো সুযোগসুবিধা লাভ করেনি।
৩.৮ জমিদার সভা ও ভারতসভার মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: জমিদার সভা ও ভারতসভার মধ্যে পার্থক্য:
দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্নকুমার ঠাকুরের উদ্যোগে ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত জমিদার সভা ছিল মূলত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকারী একটি অভিজাততান্ত্রিক সংগঠন, পক্ষান্তরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ভারতসভা ছিল মধ্যবিত্ত ও সর্বস্তরের মানুষকে সংগঠিত করে গড়ে তোলা একটি গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া জমিদার সভার উদ্দেশ্য যেখানে সীমাবদ্ধ ছিল জমিদারশ্রেণির আর্থিক ও ভূমি-সংক্রান্ত স্বার্থরক্ষার মধ্যে, সেখানে ভারতসভার লক্ষ্য ছিল সমগ্র ভারতবাসীর রাজনৈতিক অধিকার আদায় ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা।
৩.৯ ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার স্মরণীয় কেন?
উত্তর: সুচিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই কলকাতার বৌবাজার স্ট্রিটে ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসারের উদ্দেশ্যে “ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স” (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল এশিয়ার প্রাচীনতম গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম। এছাড়া তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাবিদ্যার প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যে কারণে তিনি বাংলার বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
৩.১০ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা?
উত্তর: বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার প্রভাব:
চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের হাত ধরে বাংলা মুদ্রণের সূচনা এবং ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রথম বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলায় সস্তায় বই ও সংবাদপত্র (যেমন সংবাদ কৌমুদী, সমাচার দর্পণ) প্রকাশের মাধ্যমে গণশিক্ষা ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এছাড়া বটতলা প্রকাশনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সাহিত্য পৌঁছে যাওয়ায় নতুন পাঠকশ্রেণি ও প্রকাশনা-ব্যবসার বাজার গড়ে ওঠে, যা বাংলার নবজাগরণের ভিত্তি রচনা করে।
৩.১১ আল্লুরি সীতারাম রাজু কে ছিলেন?
উত্তর: অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম অঞ্চলের আদিবাসী নেতা আল্লুরি সীতারাম রাজু (১৮৯৭-১৯২৪) ব্রিটিশ সরকারের অরণ্য আইনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ গোদাবরী অঞ্চলের আদিবাসীদের সংগঠিত করে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র রাম্পা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতি প্রয়োগ করে দীর্ঘদিন ব্রিটিশ বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখার পর ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন এবং গুলিতে নিহত হন, যে কারণে তিনি “মান্যম বীর” নামে পরিচিত।
৩.১২ ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’টি কী?
উত্তর: সাম্রাজ্যবিরোধী রাজদ্রোহমূলক কার্যকলাপের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে মুজফ্ফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, পি. সি. যোশী, ফিলিপ স্প্র্যাট প্রমুখ সমেত ৩৩ জন কমিউনিস্ট ও শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করে উত্তরপ্রদেশের মিরাটে বিচারের ব্যবস্থা করে, যা “মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা” নামে পরিচিত। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে রায় ঘোষিত হয় এবং অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হলেও এই মামলা ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রচার ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল।
৩.১৩ দীপালি সংঘ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: বিপ্লবী নেত্রী লীলা নাগ (লীলা রায়) ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় নারীদের মধ্যে শিক্ষা, শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটিয়ে তাদের স্বাবলম্বী ও বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণের উপযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যে “দীপালি সংঘ” প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংঘের মাধ্যমে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়, ব্যায়ামাগার ও গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়, যা পরবর্তীকালে বহু নারীকে জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে সাহায্য করে।
৩.১৪ গুরুচাঁদ ঠাকুর স্মরণীয় কেন?
উত্তর: মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৭-১৯৩৭) নমঃশূদ্র তথা অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ওড়াকান্দিতে বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং “মতুয়া মহাসংঘ”-এর মাধ্যমে আন্দোলন সংগঠিত করেন। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে নমঃশূদ্রদের সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে দলিত আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যে কারণে তিনি বাংলার সমাজসংস্কার আন্দোলনে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
৩.১৫ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করেছিলেন কেন?
উত্তর: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মনে করতেন যে, ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রায় ৫৬২টি দেশীয় রাজ্যের কোনোটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে টিকে থাকলে তা নবগঠিত ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক সংহতি ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে। তাই ভি. পি. মেনন-এর সহযোগিতায় গঠিত “স্টেটস ডিপার্টমেন্ট”-এর মাধ্যমে তিনি হায়দরাবাদ, জুনাগড়, কাশ্মীরের মতো ব্যতিক্রমী রাজ্যগুলি ছাড়া প্রায় সব দেশীয় রাজ্যকে “যোগদানপত্র” (Instrument of Accession) স্বাক্ষরে বাধ্য করে ভারতভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
৩.১৬ রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) গঠনের কারণ:
স্বাধীনতার পর ভাষার ভিত্তিতে পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, বিশেষত অন্ধ্র আন্দোলনে পোট্টি শ্রীরামুলুর অনশনে মৃত্যুর (১৯৫২) পর পরিস্থিতি জটিল আকার নিলে, ভারত সরকার ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ফজল আলির সভাপতিত্বে এবং হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কে. এম. পান্নিকরকে সদস্য করে “রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন” গঠন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ প্রণয়ন। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে কমিশন রিপোর্ট পেশ করলে তার ভিত্তিতে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে “রাজ্য পুনর্গঠন আইন” পাস হয়ে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়।
বিভাগ- ঘ
৪. সাত বা আটটি বাক্যে যে-কোনো ছটি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি উপরিভাগ থেকে অন্তত একটি করে প্রশ্নের উত্তর দাও) ৪×৬=২৪
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রামমোহন রায়ের ভূমিকার মূল্যায়ন করো।
উত্তর: উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রামমোহন রায়ের ভূমিকা:
ভূমিকা: ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, প্রাচ্যের সংস্কৃতিনির্ভর প্রথাগত শিক্ষার পরিবর্তে যুক্তিবাদী পাশ্চাত্য বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই ভারতীয়দের প্রকৃত জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্ভব।
ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ারের সহযোগিতায় পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ) গঠনে রামমোহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর আগে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে নিজ ব্যয়ে কলকাতায় অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি: ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে সরকার প্রাচ্য শিক্ষার প্রসারে সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে রামমোহন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে এক বিখ্যাত চিঠিতে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শিক্ষাখাতের অর্থ গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নের মতো পাশ্চাত্য বিষয়ের প্রসারে ব্যয়ের আবেদন জানান।
বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা: কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে রামমোহন ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে নিজ বাসভবনে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি বেদান্ত দর্শনও পড়ানো হত।
সহযোগিতা: এ ছাড়া তিনি ডেভিড হেয়ার, আলেকজান্ডার ডাফের মতো পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবক্তাদের বিভিন্নভাবে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
মূল্যায়ন: পরিশেষে বলা যায়, রামমোহনের এই প্রচেষ্টার হাত ধরেই পরবর্তীকালে বাংলায় তথা ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং তিনি “ভারতীয় নবজাগরণের জনক” হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
৪.২ ধর্মসংস্কার আন্দোলনরূপে ব্রাহ্ম আন্দোলনের মূল্যায়ন করো।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকীয় বাংলায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, পৌত্তলিকতা ও সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণের লক্ষ্যে রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ আগস্ট কলকাতায় “ব্রাহ্মসভা” প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের হাত ধরে ধর্মসংস্কার আন্দোলন হিসেবে ব্যাপক গুরুত্ব লাভ করে।
আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা: ব্রাহ্ম আন্দোলনের পূর্বসূরি হিসেবে রামমোহন ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় “আত্মীয় সভা” প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ উদারপন্থী ব্যক্তিদের নিয়ে সতীদাহ প্রথা, জাতিভেদ ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ধর্মালোচনা শুরু হয়।
একেশ্বরবাদ প্রচার: বেদান্ত দর্শনের ভিত্তিতে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার আদর্শ প্রচারের জন্য রামমোহন “তুহফাত-উল-মুওয়াহিদ্দিন” নামক পুস্তিকা রচনা করেন এবং বেদ-উপনিষদের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে হিন্দুশাস্ত্রেও একেশ্বরবাদের সমর্থন আছে।
দেবেন্দ্রনাথের ভূমিকা: ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর “তত্ত্ববোধিনী সভা”-কে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে একীভূত করে সংগঠনকে সুসংহত রূপ দেন এবং ব্রাহ্মধর্মের একটি নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান প্রবর্তন করেন।
কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বে বিভাজন: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেন যোগদানের পর আন্দোলনে প্রগতিশীল ভাবধারা যুক্ত হয়, তবে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে মতপার্থক্যের জেরে ব্রাহ্মসমাজ “আদি ব্রাহ্মসমাজ” (দেবেন্দ্রনাথ) ও “ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ” (কেশবচন্দ্র)-এ বিভক্ত হয়ে যায়।
সমাজসংস্কারে ভূমিকা: কেশবচন্দ্রের উদ্যোগে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে “নেটিভ ম্যারেজ অ্যাক্ট” পাসের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধ ও অসবর্ণ বিবাহের স্বীকৃতি আদায় করা হয়, যা ব্রাহ্ম আন্দোলনের সামাজিক সংস্কারমূলক দিকটি স্পষ্ট করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ব্রাহ্ম আন্দোলন কেবল ধর্মীয় সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ ও সামাজিক কুপ্রথা দূরীকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক বাংলার নবজাগরণে দিকনির্দেশক ভূমিকা পালন করে।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৩ ‘বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব’-এর ধারণাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:
ভূমিকা: ঐতিহাসিক ইরিক হবসবম ও রণজিৎ গুহ প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে, শাসকশ্রেণির শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদের তীব্রতা, ব্যাপ্তি ও পরিণতির ভিত্তিতে তা বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব নামে চিহ্নিত হয়।
বিদ্রোহ (Rebellion): কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমিত জনগোষ্ঠী যখন প্রচলিত শাসনব্যবস্থা বা অত্যাচারী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী ও সীমিত পরিসরে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাকে বিদ্রোহ বলে। যেমন— ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দের নীল বিদ্রোহ, যেখানে সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হলেও শাসনক্ষমতা দখলের লক্ষ্য ছিল না।
অভ্যুত্থান (Mutiny/Uprising): শাসকগোষ্ঠীর অধীনস্থ সংগঠিত বাহিনী বা কর্মচারীরা যখন নিজ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হঠাৎ সশস্ত্র বিরোধিতায় শামিল হয়, তাকে অভ্যুত্থান বলে। যেমন— ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ (যাকে অনেকে সিপাহি অভ্যুত্থান বলেন) এবং ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (RIN)-এর নৌ-বিদ্রোহ, যেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সদস্যরা বিদ্রোহ করে।
বিপ্লব (Revolution): কোনো দেশ বা সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সামগ্রিক, দ্রুত ও স্থায়ী পরিবর্তনকে বিপ্লব বলে। যেমন— ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লব উৎপাদনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটায়।
তুলনা: বিদ্রোহ স্থানীয় ও সংস্কারমুখী, অভ্যুত্থান সংগঠিত বাহিনীর আকস্মিক প্রতিরোধ, আর বিপ্লব ব্যাপক, দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন আনে — এই তিনটির মাত্রা ও ফলাফলের নিরিখেই মূল পার্থক্য নিহিত।
৪.৪ বারাসত বিদ্রোহের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: বারাসত বিদ্রোহের প্রকৃতি বিশ্লেষণ
বারাসত বিদ্রোহ বা তিতুমিরের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকায় এটি বহুমুখী চরিত্র বিশিষ্ট একটি আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১. ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন: প্রাথমিকভাবে এটি ইসলাম ধর্মের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করে ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রচারের আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল।
২. সাম্প্রদায়িক আন্দোলন: ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিহারীলাল সরকার প্রমুখের মতে এটি ছিল হিন্দুবিরোধী সাম্প্রদায়িক আন্দোলন, আর ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতে এটি হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সংগঠিত আক্রমণ।
৩. জমিদার বিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন: পুঁড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় একযোগে সংগ্রাম করায় হান্টার ও থর্নটন একে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলে অভিহিত করেন।
৪. কৃষক বিদ্রোহ: নরহরি কবিরাজ ও কেয়ামুদ্দিন আহমেদের মতে এটি নীলকর ও ব্রিটিশ বণিকদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিদ্রোহ, আর ডঃ বিনয়ভূষণ চৌধুরির মতে বারাসাত-বসিরহাট অঞ্চলে সাময়িকভাবে ব্রিটিশ শাসন লোপ পেয়ে কৃষকরাই ক্ষমতা দখল করেছিল।
৫. নিম্নবর্গের শ্রেণিসংগ্রাম: ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহর মতে এটি ছিল নিম্নবর্গের সাধারণ মানুষের শোষণ ও নীলকরদের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ শ্রেণিসংগ্রাম।
সবশেষে বলা যায়, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও অচিরেই তা কৃষক-জমিদার দ্বন্দ্ব ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের রূপ নেয়, যা বারাসত বিদ্রোহকে বহুমাত্রিক তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
উপবিভাগ ঘ.৩
৪.৫ বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকার মূল্যায়ন করো।
উত্তর: বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকা
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের বাংলায় মুদ্রণশিল্পের অগ্রগতিতে যাঁরা বিশেষ অবদান রাখেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হলেন লেখক, শিল্পী ও মুদ্রণবিজ্ঞানী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫ খ্রি.)।
ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা: ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ নামক ছাপাখানা, যা পরবর্তীকালে অর্ধ-টোন ব্লক প্রস্তুতির জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।
হাফ-টোন ব্লক ও রঙিন মুদ্রণ: সেসময় ইউরোপীয় পদ্ধতিতে যে হাফ-টোন ব্লক তৈরি হত, তার বহু ত্রুটি ছিল। উপেন্দ্রকিশোর নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে এই ত্রুটিগুলি দূর করে উন্নতমানের হাফ-টোন ও রঙিন ব্লক প্রস্তুত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
যন্ত্র ও পদ্ধতি উদ্ভাবন: তিনি আবিষ্কার করেন ‘রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার’ যন্ত্র এবং রঙিন মুদ্রণের জন্য ‘রে-টিন্ট প্রসেস’ ও ডুয়োটাইপ পদ্ধতি, যা মুদ্রণ প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, পরবর্তীকালে ব্রিটেনে তাঁর পরিকল্পনা অনুসরণ করে বাণিজ্যিকভাবে স্ক্রিন-অ্যাডজাস্টিং মেশিন তৈরি করা হয়, যা তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ।
সাহিত্য ও শিল্পের সংযোগ: একাধারে শিশুসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী হওয়ায় তিনি তাঁর সাহিত্যকর্ম (‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রভৃতি) নিজের ছাপাখানাতেই উন্নতমানের ছবি ও অলংকরণ সহযোগে প্রকাশ করতে সক্ষম হন, যা বাংলা শিশুসাহিত্য ও মুদ্রণশিল্প উভয়কেই সমৃদ্ধ করে।
উপসংহার: সামগ্রিকভাবে বলা যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উদ্যোগ বাংলার তথা ভারতের মুদ্রণশিল্পকে বিশ্বমানে উন্নীত করে, এবং তিনি আধুনিক বাংলা মুদ্রণশিল্পের এক পথিকৃৎ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন।
৪.৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনার সমালোচনামূলক আলোচনা করো।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনার সমালোচনামূলক আলোচনা
ভূমিকা: কবি, দার্শনিক ও শিক্ষাচিন্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.) প্রথাগত পুঁথিনির্ভর ও উপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এক মানবিক, প্রকৃতিকেন্দ্রিক ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাদর্শন গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন দিক থেকে মূল্যায়িত ও সমালোচিত হয়েছে।
শান্তিনিকেতন ও প্রকৃতিলগ্ন শিক্ষা: ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বীরভূমের শান্তিনিকেতনে তিনি ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ বা পাঠভবন প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে, গুরু-শিষ্য পরম্পরার আদর্শে শিশুশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির সান্নিধ্যেই শিশুর সহজাত সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশ সম্ভব।
সমালোচনা: তবে এই আদর্শ মূলত গ্রামীণ পরিবেশে উপযোগী ছিল, শহরাঞ্চলের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি।
উপনিবেশিক শিক্ষার সমালোচনা: রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থাকে তীব্র সমালোচনা করেন, তাঁর মতে এই শিক্ষা কেবল সরকারি কেরানি তৈরি করে, মৌলিক চিন্তা বা সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায় না।
সমালোচনা: যদিও তিনি এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও ব্যাপক বিকল্প শিক্ষাকাঠামো তিনি গড়ে তুলতে পারেননি।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি শান্তিনিকেতনে ‘বিশ্বভারতী’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানবিকতাবোধ সম্পন্ন এক বিশ্বনাগরিক গড়ে তোলা।
সমালোচনা: কিন্তু আর্থিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বল পরিকাঠামো এবং স্থানীয় বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যের অভাবে বিশ্বভারতী তার আদর্শ পুরোপুরি বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয়।
উপসংহার: সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন যুগোপযোগী, মানবিক ও আদর্শগতভাবে অত্যন্ত উন্নত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্পূর্ণ সফল হয়নি; তবু আজও তাঁর শিক্ষাচিন্তা সৃজনশীল ও মানবিক শিক্ষার আদর্শ হিসেবে প্রাসঙ্গিক।
উপবিভাগ ঘ.৪
৪.৭ স্বাধীনতালাভের পর ভারতীয় রাজ্যগুলিকে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের জন্য কী কী প্রচেষ্টা হয়েছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পর বহুভাষিক ভারতে রাজ্যগুলির পুনর্গঠন এক জটিল সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। জাতীয় ঐক্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রথমদিকে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীকালে জনদাবির কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়।
দার কমিশন ও জে ভি পি কমিটি: ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি বিবেচনার জন্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় দার কমিশন, যা এই দাবির বিপক্ষে মত দেয়। এরপর জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে গঠিত জে ভি পি কমিটিও (১৯৪৯ খ্রি.) এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
আন্দোলন ও অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন: এই প্রত্যাখ্যানের ফলে ক্ষুব্ধ জনতা আন্দোলনে সামিল হয়। তেলুগুভাষী পৃথক রাজ্যের দাবিতে পট্টি শ্রীরামুলুর অনশনে মৃত্যু (১৯৫২ খ্রি.) হলে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়, যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠন করতে বাধ্য হয়।
রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন: এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে অনুরূপ দাবি ছড়িয়ে পড়লে কেন্দ্রীয় সরকার ফজল আলির নেতৃত্বে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ গঠন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা নির্ধারণ করা।
রাজ্য পুনর্গঠন আইন, ১৯৫৬: কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’ পাস হয়, যার মাধ্যমে ১ নভেম্বর, ১৯৫৬ তারিখে ভারতে ভাষাভিত্তিক ১৪টি রাজ্য ও ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়।
উপসংহার: প্রাথমিক দ্বিধা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও অবশেষে ভাষাকেই রাজ্য পুনর্গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যা প্রমাণ করে যে বহুভাষিক ভারতে জনগণের ভাষাগত পরিচয় ও আবেগকে অস্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
৪.৮ কীভাবে কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয়?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভাজনের সময় দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারত বা পাকিস্তান—যেকোনো একটি রাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়। এই প্রেক্ষাপটে হিন্দু-শাসিত অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকে কেন্দ্র করেই কাশ্মীর সমস্যার সূত্রপাত ঘটে।
মহারাজার দ্বিধা: কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং প্রথমে ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেন, যা পরবর্তী জটিলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পাক হানাদার আক্রমণ: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-মদতপুষ্ট উপজাতি হানাদার বাহিনী কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করে ব্যাপক হত্যা, লুণ্ঠন ও ধ্বংসলীলা চালায় এবং দ্রুত শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
ভারতভুক্তির দলিল স্বাক্ষর: বিপন্ন মহারাজা হরি সিং ভারতের সামরিক সাহায্য চাইলে ভারত সরকার শর্ত দেয় যে, আগে কাশ্মীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতভুক্ত হতে হবে। এই শর্ত মেনে ২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ‘Instrument of Accession’-এ স্বাক্ষর করেন, যার ফলে কাশ্মীর আইনসম্মতভাবে ভারতভুক্ত হয়।
ভারতীয় সেনা অভিযান: দলিলে স্বাক্ষরের পরদিনই ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে অভিযান চালিয়ে হানাদারদের হটিয়ে দিয়ে কাশ্মীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, এবং শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
জাতিপুঞ্জের হস্তক্ষেপ: ভারত বিষয়টি জাতিপুঞ্জে উত্থাপন করলে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয় এবং একটি ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’ (Line of Control) নির্ধারিত হয়, যার ফলে কাশ্মীরের একাংশ পাকিস্তানের দখলে থেকে যায়, যা ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে পরিচিত হয়।
উপসংহার: এভাবে মহারাজার প্রাথমিক দ্বিধা, পাকিস্তানের সামরিক আগ্রাসন এবং জাতিপুঞ্জের অসম্পূর্ণ সমাধানের যৌথ ফলশ্রুতিতে কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের বিষয়ে পরিণত হয়, যা আজও দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার প্রধান কারণ হিসেবে বিদ্যমান।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৮×১=৮
৫.১ বাংলার নবজাগরণ বলতে কী বোঝায়? এই নবজাগরণের সীমাবদ্ধতাগুলি কী?
উত্তর:
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারার প্রভাবে সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে ব্যাপক পরিবর্তন ও জাগরণ সূচিত হয়, ইতিহাসে তা ‘বাংলার নবজাগরণ’ নামে পরিচিত। রাজা রামমোহন রায়, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষী এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন।
নবজাগরণের প্রকৃতি ও ব্যাখ্যা: ‘নবজাগরণ’ শব্দটি ফরাসি ‘রেনেসাঁস’-এর বাংলা প্রতিশব্দ, যা মূলত ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক জাগরণকে বোঝাত। এই প্রেক্ষিতেই ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তাঁর গ্রন্থে ঊনবিংশ শতকের বাংলাকে ভারতীয় নবজাগরণের প্রধান পীঠস্থান বলে উল্লেখ করেন, আর অধ্যাপক সুশোভন সরকারের মতে বাংলাতেই সর্বপ্রথম বুর্জোয়া অর্থনীতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষণীয় হয়।
প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সমন্বয়: এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-সংস্কৃতির সমন্বয়সাধন—সনাতনপন্থী পণ্ডিতরা যেমন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, তেমনি পাশ্চাত্যবাদীরাও সংস্কৃত শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেন, যার ফলশ্রুতিতে সমাজ সংস্কার আন্দোলন (সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবাবিবাহ প্রবর্তন) বেগবান হয়।
নবজাগরণ প্রশ্নে বিতর্ক: তবে বাংলার এই জাগরণ প্রকৃত অর্থে নবজাগরণ কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে তীব্র মতভেদ আছে। গবেষক অশোক মিত্র একে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত নতুন জমিদার শ্রেণিই তাদের আয়ের একাংশ কলকাতার সংস্কৃতিচর্চায় ব্যয় করত, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো সংযোগ ছিল না।
গবেষক সুপ্রকাশ রায়ের মতে বাংলার এই আন্দোলনের অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রকৃতি ইউরোপীয় নবজাগরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতধর্মী ছিল। আরও কঠোর সমালোচনা করে ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ তাঁর ‘বাংলার নবজাগৃতি’ গ্রন্থে একে সরাসরি ‘ঐতিহাসিক প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেন।
নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা: এই আন্দোলনের একাধিক সীমাবদ্ধতা লক্ষণীয়। প্রথমত, এটি ছিল মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক ও শহরাশ্রয়ী, গ্রামীণ জনসাধারণ এর সংস্পর্শে আসেনি। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় নবজাগরণে ফ্লোরেন্স নগরী যে স্বাধীনচেতা, সৃজনশীল ভূমিকা পালন করেছিল, ঔপনিবেশিক শাসনাধীন কলকাতা তা পারেনি। তৃতীয়ত, এই জাগরণ প্রধানত উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, মুসলিম সমাজ ও নিম্নবর্গের মানুষ এর বাইরে থেকে যান। চতুর্থত, জাতিভেদ প্রথা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণে এই আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
নবজাগরণের গুরুত্ব: সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই জাগরণের গুরুত্ব অপরিসীম। এর মাধ্যমেই ভারতীয়রা প্রথমবার পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হয়, এবং ভারতীয় সমাজ মধ্যযুগীয় গোঁড়ামি থেকে ধীরে ধীরে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করে।
উপসংহার: সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, বাংলার নবজাগরণ যদিও ইউরোপীয় রেনেসাঁসের অবিকল প্রতিরূপ ছিল না এবং তা শ্রেণি, ধর্ম ও ভৌগোলিক দিক থেকে সীমাবদ্ধ ছিল, তবুও ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতিতে আধুনিকতার বীজ বপনে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
৫.২ বাংলায় ছাপাখানার ব্যাবসায়িক উদ্যোগসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
উত্তর: বাংলায় ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগসমূহ
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়কালে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বহু ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ফলে মুদ্রণশিল্প ধীরে ধীরে একটি লাভজনক পেশাদার ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়। এই ব্যবসায়িক প্রসারের পিছনে সরকারি, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত—তিন স্তরের উদ্যোগই সক্রিয় ছিল।
সরকারি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা: ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে চার্লস উইলকিনস হুগলিতে বাংলা হরফের প্রথম ছাঁচ তৈরি করেন এবং পরবর্তীকালে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বাণিজ্যিক উদ্যোগে ‘অনারেবল কোম্পানিজ প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাপাখানা।
অফিস-আদালতের চাহিদা: ব্রিটিশ শাসন বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অফিস-আদালতের জন্য মিলিটারি বিধিনিয়ম, বিজ্ঞপ্তি, রাজস্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র মুদ্রণের প্রয়োজন বৃদ্ধি পায়, যা ছাপাখানার ব্যবসাকে উল্লেখযোগ্যভাবে চাঙ্গা করে তোলে।
সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশ: অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ‘বেঙ্গল গেজেট’, ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’-র মতো দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকলে ছাপাখানার ব্যবসা আরও বিস্তার লাভ করে, কারণ এগুলি প্রকাশের জন্য নিয়মিত মুদ্রণ পরিষেবার প্রয়োজন হত।
পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্য প্রকাশ: ছাপাখানার মালিকেরা অক্ষরজ্ঞান, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলের পাঠ্যবই এবং সাহিত্য, কবিতা, নাটক, ধর্মগ্রন্থ ও অনুবাদ গ্রন্থ ছাপিয়ে বাজারজাত করতে শুরু করেন, যা তাঁদের ব্যবসাকে দ্রুত লাভজনক করে তোলে।
গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের অবদান: প্রথম বাঙালি প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ গ্রন্থটি চিত্রসহ প্রকাশ করে বাঙালি পরিচালিত মুদ্রণ-ব্যবসার সূচনা করেন।
বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্যবসায়িক উদ্যোগে ‘সংস্কৃত প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখান থেকে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কপি ‘বর্ণপরিচয়’ মুদ্রিত হয়। ছাপাখানা-ব্যবসায় তাঁর দক্ষতার জন্য তাঁকে ‘বিদ্যাবণিক’ আখ্যা দেওয়া হয়।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর অবদান: আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ ছাপাখানা হাফ-টোন ব্লক ও রঙিন মুদ্রণ পদ্ধতির উদ্ভাবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে এবং বাংলার মুদ্রণ-ব্যবসাকে বিশ্বমানে উন্নীত করে।
উপসংহার: সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সরকারি প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকে শুরু করে সংবাদপত্র, পাঠ্যপুস্তক ও সাহিত্য প্রকাশনার মাধ্যমে ঊনবিংশ শতকে বাংলায় ছাপাখানা একটি সংগঠিত, লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়, এবং এই ব্যবসায়িক উদ্যোগই পরবর্তীকালে বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসারের ভিত্তি রচনা করে।
৫.৩ বারদৌলি আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। তুমি কি মনে করো যে, এই আন্দোলন ভূমিহীন কৃষকশ্রেণি এবং কৃষি-শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় সফল হয়েছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষকদের যে ব্যাপক অহিংস কর-বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়, তা ‘বারদৌলি সত্যাগ্রহ’ নামে পরিচিত।
পটভূমি: ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ বন্যায় ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিতে সরকার ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে খাজনার হার ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
সামাজিক গঠন: বারদৌলির কৃষিসমাজ ছিল স্তরবিন্যস্ত—সম্পন্ন ‘কুনবি পাতিদার’ জমির মালিক, আর তাদের অধীনে ‘হালি’ প্রথায় কাজ করত নিম্নবর্ণের ভূমিহীন ‘কালিপারাজ’ শ্রমিকেরা, যারা প্রকৃতপক্ষে ঋণদাসের মতো অবস্থায় ছিল।
নেতৃত্ব ও সংগঠন: বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে নরহরি পারিখ, রবিশংকর ব্যাস, মোহনলাল পান্ডে প্রমুখ এবং মিঠুবেন প্যাটেল, সারদা মেহতার মতো নারীরা আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। কৃষকদের কর প্রত্যাখ্যান, জমি বাজেয়াপ্তের প্রতিরোধ প্রভৃতি কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
সরকারি দমন ও প্রভাব: সরকার জমি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। আন্দোলনের সমর্থনে বোম্বাই বিধানসভার সদস্য কে. এম. মুন্সি ও লালজি নারাণজি পদত্যাগ করেন এবং গান্ধিজি স্বয়ং আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
নিষ্পত্তি: ব্যাপক চাপে সরকার ম্যাক্সওয়েল-ব্রুমফিল্ড কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয় এবং ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে একটি সমঝোতার মাধ্যমে খাজনা বৃদ্ধির হার ২২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬.০৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয় এবং বাজেয়াপ্ত জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সাফল্য: এই আন্দোলন মূলত জমির মালিক পাতিদার কৃষকশ্রেণির খাজনা-সংক্রান্ত দাবি আদায়ে যথেষ্ট সফল হয়েছিল এবং এটি সত্যাগ্রহ পদ্ধতির কার্যকারিতা আরও একবার প্রমাণ করে।
ভূমিহীন কৃষক ও কৃষি-শ্রমিকদের প্রশ্নে সীমাবদ্ধতা: তবে এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমি-মালিক পাতিদারদের খাজনা হ্রাস, ভূমিহীন ‘কালিপারাজ’ কৃষি-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, জমির অধিকার বা ‘হালি’ প্রথার বিলোপের মতো বিষয় আন্দোলনের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পায়নি। ফলে আন্দোলনের সাফল্যের সুফল মূলত সম্পন্ন কৃষকশ্রেণির কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে, প্রকৃত ভূমিহীন ও শ্রমজীবী শ্রেণির আর্থ-সামাজিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
উপসংহার: সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, বারদৌলি সত্যাগ্রহ ঔপনিবেশিক রাজস্বনীতির বিরুদ্ধে কৃষক সংহতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেও, ভূমিহীন কৃষক ও কৃষি-শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় এটি তেমন সফল হয়নি; বরং এটি ছিল মূলত সম্পন্ন কৃষক-জোতদার শ্রেণির স্বার্থরক্ষার আন্দোলন।
