মাধ্যমিক পরীক্ষা মানেই একরাশ চাপ, আর তার মধ্যে ইতিহাস বিষয়টা অনেকের কাছেই একটু ভয়ের! বিশেষ করে যখন পরীক্ষার আগে পুরনো বছরের প্রশ্নপত্র হাতে না থাকে, তখন প্রস্তুতি নেওয়াটা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণেই আজকের এই পোস্টে আমরা নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক 2022 ইতিহাস প্রশ্ন উত্তর পিডিএফ, যা তোমাদের প্রস্তুতিকে করে তুলবে আরও সহজ ও গোছানো।
যারা Madhyamik 2022 History Question Answer PDF খুঁজছ, তাদের জন্য এই পোস্টে থাকছে সম্পূর্ণ প্রশ্নের বিস্তারিত ও নির্ভুল সমাধান। শুধু উত্তর দেওয়াই নয়, মাধ্যমিক ২০২২ এর ইতিহাস প্রশ্নের সমাধান এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তোমরা প্রতিটি প্রশ্নের পেছনের ধারণাটাও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারো, যা পরবর্তী পরীক্ষার জন্যও কাজে লাগবে।
এছাড়াও, যাদের কাছে এখনও Madhyamik 2022 History Question Paper PDF নেই, তাদের সুবিধার জন্য এই পোস্টে সেটিও যুক্ত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ মাধ্যমিক ২০২২ এর ইতিহাস প্রশ্নপত্র ডাউনলোড করে তোমরা নিজেরাই একবার প্র্যাকটিস করে দেখতে পারো, তারপর উত্তরের সাথে মিলিয়ে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতে পারো। তাহলে আর দেরি না করে চলো শুরু করা যাক।
বিভাগ- ক
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখ: ১×২০=২০
১.১ সত্যজিৎ রায় যুক্ত ছিলেন —
(ক) খেলার ইতিহাসে
(খ) শহরের ইতিহাসে
(গ) নারীর ইতিহাসে
(ঘ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
উত্তর: (ঘ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
১.২ রেশম আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন —
(ক) ভারতে
(খ) রোমে
(গ) পারস্যে
(ঘ) চিন দেশে
উত্তর: (ঘ) চিন দেশে
১.৩ ‘নিষিদ্ধ শহর’ বলা হয় —
(ক) লাসাকে
(খ) বেইজিংকে
(গ) রোমকে
(ঘ) কনস্ট্যান্টিনোপলকে
উত্তর: (খ) বেইজিংকে, লাসাকে
১.৪ ‘বঙ্গদর্শন’ সাময়িকপত্রটি ছিল একটি —
(ক) সাপ্তাহিক পত্রিকা
(খ) পাক্ষিক পত্রিকা
(গ) মাসিক পত্রিকা
(ঘ) বাৎসরিক পত্রিকা
উত্তর: (গ) মাসিক পত্রিকা
১.৫ ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ছাপা হয়েছিল —
(ক) নদিয়াতে
(খ) ঢাকায়
(গ) শ্রীরামপুরে
(ঘ) কলকাতায়
উত্তর: (খ) ঢাকায়
১.৬ রামমোহন রায়-এর পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ পরিচালনা করেন —
(ক) অক্ষয়কুমার দত্ত
(খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ
(ঘ) তারাচাঁদ চক্রবর্তী
উত্তর: (খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.৭ বাঙালি পরিচালিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্রটি হল —
(ক) সমাচার দর্পণ
(খ) সংবাদ প্রভাকর
(গ) ব্রাহ্মণ সেবধি
(ঘ) বাঙ্গাল গেজেটি
উত্তর: (খ) সংবাদ প্রভাকর
১.৮ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম স্নাতক ছিলেন —
(ক) সৈয়দ আমির আলি
(খ) আবদুল লতিফ
(গ) দেলওয়ার হোসেন আহমেদ
(ঘ) সৈয়দ আহমদ
উত্তর: (গ) দেলওয়ার হোসেন আহমেদ
১.৯ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি আদিবাসী বিদ্রোহ হল —
(ক) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ
(খ) চুয়াড় বিদ্রোহ
(গ) কোল বিদ্রোহ
(ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
উত্তর: (খ) চুয়াড় বিদ্রোহ
১.১০ ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন —
(ক) ভিনসেন্ট স্মিথ
(খ) জেমস মিল
(গ) ওয়ারেন হেস্টিংস
(ঘ) লর্ড কর্নওয়ালিশ
উত্তর: (গ) ওয়ারেন হেস্টিংস
১.১১ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কৃষক বিদ্রোহটি হল —
(ক) চুয়াড় বিদ্রোহ
(খ) ফরাজি আন্দোলন
(গ) সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ
(ঘ) সাঁওতাল বিদ্রোহ
উত্তর: (গ) সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ
১.১২ মির নিশার আলি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন —
(ক) বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনে
(খ) ফরাজি আন্দোলনে
(গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহে
(ঘ) নীল বিদ্রোহে
উত্তর: (গ) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহে
১.১৩ ‘রাষ্ট্রগুরু’ নামে পরিচিত ছিলেন —
(ক) রামমোহন রায়
(খ) রাজনারায়ণ বসু
(গ) নবগোপাল মিত্র
(ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তর: (ঘ) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১.১৪ মহাবিদ্রোহকে (১৮৫৭) ‘কৃষক বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন —
(ক) সুরেন্দ্রনাথ সেন
(খ) রমেশচন্দ্র মজুমদার
(গ) শশীভূষণ চৌধুরি
(ঘ) বিনায়ক দামোদর সাভারকর
উত্তর: (গ) শশীভূষণ চৌধুরি
১.১৫ আনন্দমোহন বসু ছিলেন ভারতসভার —
(ক) প্রতিষ্ঠাতা
(খ) সভাপতি
(গ) সহ-সভাপতি
(ঘ) সচিব
উত্তর: (ক) প্রতিষ্ঠাতা
১.১৬ ‘বন্দেম্মাতরম’ সংগীতটি রচনা করেন —
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ
উত্তর: (গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
১.১৭ বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা জগদীশচন্দ্র বসু অধ্যাপক ছিলেন —
(ক) গণিতশাস্ত্রের
(খ) রসায়ন শাস্ত্রের
(গ) পদার্থবিদ্যার
(ঘ) উদ্ভিদবিদ্যার
উত্তর: (গ) পদার্থবিদ্যার
১.১৮ ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল —
(ক) ১৮৩৩ খ্রি.
(খ) ১৮৫৬ খ্রি.
(গ) ১৮৮০ খ্রি.
(ঘ) ১৯০৩ খ্রি.
উত্তর: (খ) ১৮৫৬ খ্রি.
১.১৯ ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (১৯০৬)-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন —
(ক) রাসবিহারী ঘোষ
(খ) অরবিন্দ ঘোষ
(গ) তারকনাথ পালিত
(ঘ) সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
উত্তর: (ক) রাসবিহারী ঘোষ
১.২০ ‘দিগদর্শন’-এর সম্পাদক ছিলেন —
(ক) উইলিয়ম কেরি
(খ) জোশুয়া মার্শম্যান
(গ) ফেলিক্স কেরি
(ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান
উত্তর: (ঘ) জন ক্লার্ক মার্শম্যান
বিভাগ-খ
২। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্ততঃ ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও): ১×১৬=১৬
উপবিভাগ ২.১
একটি বাক্যে উত্তর দাও: ১×৪=৪
২.১.১ কোন বছর ‘সোমপ্রকাশ’ এর প্রকাশনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়?
উত্তর: ১৮৭৮ সালে সোমপ্রকাশ পত্রিকার প্রকাশনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
২.১.২ কলকাতার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যগুলির যে-কোনো একটি উল্লেখ করো।
উত্তর: রাইটার্স বিল্ডিং/ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।
২.১.৩ রেভা: জেমস লঙ কোন্ অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিলেন?
উত্তর: রেভারেন্ড জেমস লং দীনবন্ধু মিত্র রচিত “নীলদর্পণ” নাটকের ইংরেজি অনুবাদ (“Nil Durpan, or The Indigo Planting Mirror”) প্রকাশ করেছিলেন, যা অনুবাদ করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই নাটকে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরা হয়েছিল বলে ক্ষুব্ধ নীলকরেরা জেমস লং-এর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করেন। সেকারণে তাঁকে মানহানির মামলায় জরিমানা সহ স্বল্প সময়ের কারাবাস ভোগ করতে হয়।
২.১.৪ বিদ্যাহারাবলী’ গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
উত্তর: বিদ্যাহারাবলী গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন ফেলিক্স কেরি।
উপবিভাগ ২.২
ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো: ১×৪=৪
২.২.১ ভারতে কামান প্রথম ব্যবহৃত হয় পলাশির যুদ্ধে।
উত্তর: ভুল
২.২.২ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান ক্লাব আই এফ এ শিল্ড জয় করেছিল।
উত্তর: ঠিক
২.২.৩ প্রথম বিধবাবিবাহ করেন শ্রীশচন্দ্র ন্যায়রত্ন।
উত্তর: ঠিক
২.২.৪ ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটির অন্যতম সম্পাদক ছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুর।
উত্তর: ঠিক
উপবিভাগ ২.৩
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও: ১×৪=৪
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (১) জমিদার সভা |
| ২.৩.২ রামমোহন রায় | (২) হান্টার কমিশন |
| ২.৩.৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর | (৩) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট |
| ২.৩.৪ তারকনাথ পালিত | (৪) অ্যাংলো হিন্দু স্কুল |
উত্তর:
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (২) হান্টার কমিশন |
| ২.৩.২ রামমোহন রায় | (৪) অ্যাংলো হিন্দু স্কুল |
| ২.৩.৩ দ্বারকানাথ ঠাকুর | (১) জমিদার সভা |
| ২.৩.৪ তারকনাথ পালিত | (৩) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট |
উপবিভাগ ২.৪
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত কর ও নামাঙ্কিত কর: ১×৪=৪
২.৪.১ নীল বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র-নদিয়া
২.৪.২ কোল বিদ্রোহের এলাকা-ছোটোনাগপুর
২.৪.৩ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র-দিল্লি
২.৪.৪ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) অন্যতম কেন্দ্র কানপুর
উত্তর:

উপবিভাগ ২.৫
নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন কর: ১×৪=৪
২.৫.১ বিবৃতি: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের জন্য হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ১: এই কলেজে শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
ব্যাখ্যা ২: এই কলেজে হিন্দু ও ব্রাহ্ম ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
ব্যাখ্যা ৩: এই কলেজে সকল ধর্মের ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: এই কলেজে শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল।
২.৫.২ বিবৃতি: ঔপনিবেশিক সরকার উপজাতিদের জন্য ‘দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি’ নামে একটি পৃথক অঞ্চল গঠন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা ১: এটি গঠিত হয়েছিল চুয়াড় বিদ্রোহের পর।
ব্যাখ্যা ২: এটি গঠিত হয়েছিল কোল বিদ্রোহের পর।
ব্যাখ্যা ৩: এটি গঠিত হয়েছিল মুন্ডা বিদ্রোহের পর।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি গঠিত হয়েছিল কোল বিদ্রোহের পর।
২.৫.৩ বিবৃতি: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসু ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যাখ্যা ১: এটি উদ্ভিদবিদ্যা গবেষণার উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ২: এটি বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যাখ্যা ৩: এটি বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
২.৫.৪ বিবৃতি: উনিশ শতকে বাংলার প্রকাশকগণ তাদের বই বিক্রির জন্য ফেরিওয়ালাদের ওপর নির্ভর করতেন।
ব্যাখ্যা ১: কারণ, বইয়ের দোকান ছিল অত্যন্ত সীমিত।
ব্যাখ্যা ২: কারণ, বই বিক্রি করাকে নিম্নস্তরের পেশা বলে মনে করা হত।
ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এটি ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছোবার সুলভতম ও সহজতম উপায়।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: কারণ, এটি ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছোবার সুলভতম ও সহজতম উপায়।
বিভাগ -গ
৩ . দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে কোনো ১১টি): ২×১১=২২
৩.১ সামরিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব কী?
উত্তর: সামরিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব নিম্নরূপ —
১) যুদ্ধপদ্ধতি ও রণকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান: বিভিন্ন যুগে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি, অস্ত্রশস্ত্র ও রণকৌশলের ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়।
২) রাষ্ট্রগঠন ও সাম্রাজ্য বিস্তারে ভূমিকা: সামরিক শক্তি কীভাবে রাষ্ট্রের উত্থান-পতন ও সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রভাব ফেলেছিল তা বোঝা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, যদুনাথ সরকারের ‘মিলিটারি হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ এবং সুবোধ ঘোষের ‘ভারতীয় ফৌজের ইতিহাস’ গ্রন্থ দুটি সামরিক ইতিহাসচর্চার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
৩.২ ‘সরকারি নথিপত্র’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সরকারি নথিপত্র বলতে বোঝায় সরকার বা প্রশাসনিক দপ্তর কর্তৃক প্রস্তুত ও সংরক্ষিত বিভিন্ন সরকারি নথি, যেমন — চিঠিপত্র, প্রতিবেদন, আইন, বিধিনিয়ম, জনগণনা রিপোর্ট, বিচার বিভাগীয় নথি, রাজস্ব সংক্রান্ত নথি ইত্যাদি। ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এই নথিপত্রগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি থেকে সমকালীন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
যেমন — ন্যাশনাল আর্কাইভস অফ ইন্ডিয়া, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট আর্কাইভস প্রভৃতিতে সংরক্ষিত সরকারি নথিপত্র ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
৩.৩ স্কুল বুক সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে ও উইলিয়াম কেরির সহযোগিতায় কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নত মানের পাঠ্যপুস্তক রচনা, প্রকাশ ও সুলভ মূল্যে বিতরণ করা, যাতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো যায়।
৩.৪ মধুসূদন গুপ্ত স্মরণীয় কেন?
উত্তর: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মধুসূদন গুপ্ত জাতি-ধর্মের বাধা ও কুসংস্কার উপেক্ষা করে ভারতে সর্বপ্রথম মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ (Human Dissection) করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার পর তোপধ্বনি দিয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা আধুনিক অ্যানাটমি শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ যুগান্তকারী গুরুত্ব বহন করে বলে তিনি স্মরণীয়।
৩.৫ লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর ‘শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনামা’ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ এক শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনামা জারি করে ঘোষণা করেন যে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের আকর্ষণ ও চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কারণেই লর্ড হার্ডিঞ্জের শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনামাটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৩.৬ ‘বাংলার নবজাগরণ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ঊনবিংশ শতকে ইংরেজ শাসনকালে পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞানচেতনা ও যুক্তিবাদের প্রভাবে বাংলায় যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ঘটেছিল, তাকেই “বাংলার নবজাগরণ” বলা হয়। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মনীষীর হাত ধরে সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই নবজাগরণ প্রতিফলিত হয়।
৩.৭ ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হল কেন?
উত্তর: দুদু মিয়াঁর মৃত্যুর (১৮৬০) পর ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্বের দুর্বলতা দেখা দেয়, ফলে আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। এছাড়া আন্দোলনটি মূলত পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় এটি সর্বভারতীয় বা ব্যাপক গণ-আন্দোলনের রূপ নিতে পারেনি। সুসংবদ্ধ সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্যের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়।
৩.৮ তিতুমির স্মরণীয় কেন?
উত্তর: তিতুমির (সৈয়দ মীর নিসার আলি) উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার কৃষক-প্রজাদের নিয়ে ব্রিটিশ শাসন ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং নিজেকে “বাদশাহ” ঘোষণা করে স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে তিনি প্রাণ বিসর্জন দেন। কৃষক-প্রজাদের অধিকার রক্ষায় তাঁর এই সাহসী নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য তিনি স্মরণীয়।
৩.৯ শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশ কেন মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) বিরোধিতা করেছিল?
উত্তর: শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি অংশ পাশ্চাত্য শিক্ষা ও যুক্তিবাদের প্রভাবে বিশ্বাস করত যে, ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমেই ভারতে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানচেতনা ও সমাজ সংস্কার সম্ভব। তাই তারা মহাবিদ্রোহকে “সনাতনপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিদ্রোহ” বলে মনে করত, যা দেশকে পশ্চাদমুখী করবে। এই কারণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্ব-সহ শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একাংশ এবং সাময়িকপত্র যেমন ‘সোমপ্রকাশ’ মহাবিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল।
৩.১০ ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয় কেন?
উত্তর: সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা, শাসকশ্রেণির অন্যায়-অত্যাচার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মকভাবে জনমত গঠন ও সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয়। হাস্যরসের মাধ্যমে জটিল বিষয়কে সহজ-সরলভাবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এর মূল লক্ষ্য। ঊনবিংশ শতকে বাংলায় ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’, ‘সোমপ্রকাশ’ ও কালীঘাট পটচিত্রে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছিল।
৩.১১ নবগোপাল মিত্র কে ছিলেন?
উত্তর: নবগোপাল মিত্র (১৮৪০-১৮৯৪) ছিলেন উনিশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ, সাংবাদিক ও সংগঠক। স্বদেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা জাগরণের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে রাজনারায়ণ বসুর অনুপ্রেরণায় “হিন্দুমেলা” (জাতীয় মেলা) প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি রচনা করে। এই কারণে তাঁকে “জাতীয় নবগোপাল মিত্র” নামেও অভিহিত করা হয়।
৩.১২ উনিশ শতকের বাংলায় জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত “আনন্দমঠ” উপন্যাসে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে “সন্তানদল”-এর মাধ্যমে স্বদেশপ্রেম ও সংগ্রামী জাতীয়তাবোধের আদর্শ তুলে ধরেন। এই উপন্যাসে রচিত তাঁর “বন্দেমাতরম্” সংগীতটি পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। “দেবী চৌধুরাণী” উপন্যাসেও তিনি স্বদেশচেতনার প্রতিফলন ঘটান, যার ফলে বাংলার তথা ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম।
৩.১৩ জাতীয় শিক্ষা পরিষদ কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: স্বদেশি আন্দোলনের (১৯০৫) সময় ব্রিটিশ সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ইংরেজি-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বর্জন করে মাতৃভাষায় জাতীয় ভাবধারায় শিক্ষাদানের লক্ষ্যে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের সহযোগিতায় “জাতীয় শিক্ষা পরিষদ” (National Council of Education) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে স্বদেশি ভাবাপন্ন যুব সমাজ গড়ে তোলা।
৩.১৪ ‘বিদ্যাসাগর সাট’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিদ্যাসাগর মুদ্রণের সুবিধার জন্য পূর্বপ্রচলিত ১৬টি স্বরবর্ণ ও ৩৪টি ব্যঞ্জনবর্ণ (মোট ৫০টি বর্ণ) সংস্কার করে বৈজ্ঞানিকভাবে ১২টি স্বরবর্ণ ও ৪০টি ব্যঞ্জনবর্ণ (মোট ৫২টি বর্ণ) নির্দিষ্ট করেন এবং ছেদ-যতি চিহ্নসহ বাংলা মুদ্রাক্ষর বিন্যাসের একটি সুসংগঠিত, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি তৈরি করেন। তাঁর নামানুসারে বাংলা মুদ্রণের ইতিহাসে এই পদ্ধতি “বিদ্যাসাগর সাট” নামে পরিচিত।
৩.১৫ বাংলা ছাপাখানার বিকাশে লাইনোটাইপ প্রবর্তনের গুরুত্ব কী?
উত্তর: আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সুরেশচন্দ্র মজুমদারের উদ্যোগে বাংলা মুদ্রণে লাইনোটাইপ প্রবর্তিত হয়, যা বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসে যুগান্তকারী গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে একসাথে অক্ষর, যুক্তাক্ষর, বিরামচিহ্ন ও স্পেস সাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে ছাপার কাজ দ্রুত ও সহজ হয়ে ওঠে, ফলে সংবাদপত্র, পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থ প্রকাশনার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এইভাবে লাইনোটাইপ বাংলা মুদ্রণশিল্পে এক বিপ্লব ঘটায়।
৩.১৬ গ্রামীণ শিল্প ও বৃত্তিশিক্ষার প্রসারে রবীন্দ্রনাথ-এর অবদান কীরূপ ছিল?
উত্তর: ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ কৃষিবিদ লেনার্ড এলমহার্স্ট ও কালীমোহন ঘোষের সহযোগিতায় শান্তিনিকেতনের কাছে “শ্রীনিকেতন” নামে একটি পল্লি উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ শিল্প ও বৃত্তিশিক্ষার মাধ্যমে গ্রামবাসীদের স্বনির্ভর করে তোলা। এখানে হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প, কুটিরশিল্পের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ও সমবায় চাষের প্রচলন করা হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিভাগ-ঘ
৪. সাত যা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ২টি করে প্রশ্নসহ মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হতে) ৪×৬=২৪
উপবিভাগ ঘ.১
৪.১ উনিশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারে রাজা রাধাকান্ত দেব কীরূপ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারে রক্ষণশীল হিন্দুনেতা হয়েও রাজা রাধাকান্ত দেব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১) ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ পুস্তিকা প্রকাশ: ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় স্কুল বুক সোসাইটির পণ্ডিত গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেন, যেখানে নারীশিক্ষা শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয় বলে যুক্তি দেখানো হয়।
২) মিশনারিদের সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ: ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মিশনারি W.H.পিয়ার্সকে পত্র লিখে নারীশিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানান এবং নিজ পরিবারের মহিলাদের শিক্ষাদানের জন্য বিদেশি শিক্ষিকা নিয়োগ করেন।
৩) প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সমন্বয়ী দৃষ্টিভঙ্গি: তিনি চেয়েছিলেন হিন্দু সমাজের সনাতন কাঠামো বজায় রেখেই পাশ্চাত্য শিক্ষার সুফল গ্রহণ করা হোক, যাতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সংঘাত এড়ানো যায়।
উপসংহার: সতীদাহের মতো কুপ্রথা সমর্থন করে তাঁর ভাবমূর্তি কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, নারীশিক্ষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রাধাকান্ত দেবের অবদান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৪.২ লর্ড মেকলেকে কি এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তক বলা যায়?
উত্তর: লর্ড মেকলেকে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার সম্পূর্ণ ও একমাত্র প্রবর্তক বলা যায় না, যদিও পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা সিদ্ধান্তমূলক ছিল।
মেকলের অবদান (পক্ষে যুক্তি): ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর-জেনারেলের পরিষদীয় সদস্য লর্ড মেকলে বড়লাট বেন্টিঙ্কের কাছে বিখ্যাত “মেকলে মিনিট” পেশ করেন, যেখানে তিনি প্রাচ্য শিক্ষাকে “অবৈজ্ঞানিক ও নিকৃষ্ট” আখ্যা দিয়ে সরকারি অর্থে ইংরেজি মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের সুপারিশ করেন। এর ফলে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে “ইংলিশ এডুকেশন অ্যাক্ট” পাস হয়ে প্রাচ্যবাদী-পাশ্চাত্যবাদী (Orientalist-Anglicist) বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটে।
পূর্বতন উদ্যোগ (বিপক্ষে যুক্তি): কিন্তু মেকলের আগে থেকেই ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছিল — ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে শিক্ষাখাতে অর্থ বরাদ্দের বিধান ছিল, ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দেই ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে “হিন্দু কলেজ” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, শ্রীরামপুর মিশনারিরা পাশ্চাত্য ধাঁচের বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, এবং রাজা রামমোহন রায় ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড আমহার্স্টকে পত্র লিখে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
উপসংহার: সুতরাং মেকলে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তক নন, বরং ইতিমধ্যে চলমান বিতর্কের নিষ্পত্তিকারী ও নীতি-প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকারী হিসেবেই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
৪.৩ ঔপনিবেশিক সরকার কী উদ্দেশ্যে অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল?
উত্তর: প্রথমে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার যে দুটি অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষা ও বনভূমির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করা। এর প্রস্তুতি হিসেবে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান বনবিশেষজ্ঞ ডিয়েট্রিক ব্রান্ডিসের নেতৃত্বে ভারতীয় বনবিভাগ (Forest Department) গঠিত হয়েছিল।
উদ্দেশ্যগুলি:
১. রাজকীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ও রেলপথের স্লিপার তৈরির জন্য কাঠ সংগ্রহ।
২. অরণ্যভূমি পরিষ্কার করে কৃষিজমি সম্প্রসারণ করে রাজস্ব বৃদ্ধি।
৩. আদিবাসীদের ঝুম চাষের বদলে স্থায়ী কৃষিতে অভ্যস্ত করে তোলা।
৪. বনজ সম্পদকে বাণিজ্যিক মুনাফার উৎসে পরিণত করা।
৫. বনভূমিকে সংরক্ষিত, সুরক্ষিত ও গ্রামীণ (অশ্রেণিভুক্ত) — এই তিন ভাগে বিভক্ত করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
এর ফলে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত অরণ্যের অধিকার, জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহের (যেমন সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ) জন্ম দেয়।
৪.৪ নীল বিদ্রোহে সংবাদপত্রের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: নীল বিদ্রোহে (১৮৫৯-৬০) জনমত গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম প্রকাশ: নীলকরদের অত্যাচার ও কৃষকদের প্রতিবাদের খবর প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ও ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায়।
হিন্দু প্যাট্রিয়ট: সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সাংবাদিক নিয়োগ করে নীলচাষিদের দুর্দশার খবর সংগ্রহ করে ‘নীল জেলা’ নামক বিভাগে প্রকাশ করতেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি লেখেন যে বাংলার নীলচাষ একটি সংগঠিত জুয়োচুরি ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা মাত্র।
অমৃতবাজার পত্রিকা: সম্পাদক শিশিরকুমার ঘোষ যশোর-নদিয়ার গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাষিদের সংগঠিত করে বাংলার প্রথম “ফিল্ড জার্নালিস্ট” হিসেবে পরিচিতি পান।
অন্যান্য পত্রিকা: অক্ষয়কুমার দত্ত ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় নীলচাষিদের দুরবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন; ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’-ও একই বিষয় তুলে ধরে।
উপসংহার: সংবাদপত্র ছাড়াও দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক জনমত গঠনে সহায়ক হয়। পত্রপত্রিকা ও বুদ্ধিজীবীমহলের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা নীল বিদ্রোহকে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত করে।
উপবিভাগ ঘ.২
৪.৫ জাতীয়তাবাদ প্রসারে হিন্দুমেলার ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠা: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু ও মনোমোহন বসুর উদ্যোগে কলকাতায় হিন্দুমেলা (জাতীয় মেলা) প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয়তাবাদ প্রসারে এর ভূমিকা নিম্নরূপ:
১) দেশপ্রেমের জাগরণ: হিন্দুমেলা ভারতবাসীর মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে কাজ করে। এই মেলা কোনো ধর্মীয় বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মঞ্চ ছিল।
২) স্বদেশী সংস্কৃতির প্রচার: ভারতীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে আত্মপরিচয়ের বোধ জাগ্রত করা হয়।
৩) পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতিরোধ: পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব প্রতিরোধ করে হিন্দু ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়।
৪) সামাজিক ঐক্য ও শারীরিক সক্ষমতা গঠন: বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করার পাশাপাশি যুবকদের শারীরিক কসরতের মাধ্যমে সক্ষম করে তোলা হয়, যাতে তারা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশ নিতে পারে।
উপসংহার: প্রাথমিক পর্যায়ের সংগঠন হলেও হিন্দুমেলা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ বপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৪.৬ ‘গোরা’ উপন্যাসটিতে রবীন্দ্রনাথের যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায় তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
১) সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে অবস্থান: গোরা প্রথমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চিন্তায় আকৃষ্ট হলেও পরে উপলব্ধি করে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের একমাত্র বা সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়।
২) ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা: রবীন্দ্রনাথ বর্ণবৈষম্যের নিন্দা করে ব্রিটিশ-বিরোধিতা ও স্বদেশপ্রেমের আদর্শ তুলে ধরেন।
৩) মানবতাবাদী জাতীয়তাবাদ: গোরা শেষে নিজেকে হিন্দু-ব্রাহ্ম নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের সন্তান বলে ঘোষণা করে — “আমার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান কোনো বিরোধ নেই” (সংক্ষিপ্তভাবে quote করলেই যথেষ্ট)।
৪) উদার ও বহুত্ববাদী ভারতের কল্পনা: রবীন্দ্রনাথ ভারতকে একটি বহুত্ববাদী, উদার জাতি হিসেবে দেখান, ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে।
উপসংহার: এভাবে ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও মানবতাবাদী জাতীয়তাবাদের দর্শন তুলে ধরেছেন।
৪.৭ ছাপাখানা বাংলায় শিক্ষাবিস্তারে কীরূপ পরিবর্তন এনেছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলায় শিক্ষার প্রসারে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আসে। পূর্বে শিক্ষা উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, ছাপাখানার হাত ধরে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
১) শ্রীরামপুর মিশন প্রেস: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি শ্রীরামপুর মিশন প্রেস স্থাপন করেন, যেখান থেকে বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় বাইবেল ও বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়।
২) পাঠ্যপুস্তকের প্রসার: বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’, মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’-র মতো বই শিশুশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
৩) সস্তায় বই মুদ্রণ: ছাপাখানার ফলে বই কম খরচে ও দ্রুত ছাপা সম্ভব হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসে, যা পূর্বে সম্ভব ছিল না।
৪) সংবাদপত্রের প্রসার: সমাচার দর্পণ, সংবাদ কৌমুদীর মতো পত্রিকা প্রকাশের ফলে জনশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
উপসংহার: এভাবে ছাপাখানা বাংলার শিক্ষাবিস্তার তথা নবজাগরণের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
৪.৮ বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
ভূমিকা: বাংলা মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে কম্পোজিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে কলকাতায় স্বাধীনভাবে মুদ্রণ ব্যবসায় যুক্ত হন।
১) প্রথম সচিত্র গ্রন্থ: তিনি ফেরিস কোম্পানির মুদ্রাকর হিসেবে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য ছবিসহ প্রকাশ করেন, যা বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র গ্রন্থ।
২) প্রথম বাংলা সংবাদপত্র: বন্ধু হরচন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় তিনি ‘বাঙ্গাল গেজেট’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, যাকে অনেকে বাংলার প্রথম সংবাদপত্র বলে মনে করেন।
৩) নিজস্ব ছাপাখানা স্থাপন: ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার চোরাবাগানে তিনি ‘বাঙ্গাল গেজেট প্রেস’ স্থাপন করেন, যা ছিল বাঙালি মালিকানায় প্রথম ছাপাখানা।
৪) প্রকাশনা ব্যবসায় অবদান: তিনি একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রয়ের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সহায়তা করেন।
উপসংহার: গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বাংলা মুদ্রণ শিল্পের প্রারম্ভিক যুগের এক পথপ্রদর্শক, যাঁর উদ্যোগে উনিশ শতকের গোড়ায় বাংলা মুদ্রণ শিল্প শক্তিশালী ভিত্তি পায়।
বিভাগ-ঙ
৫. পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৮×১=৮
৫.১ উনিশ শতকের বাংলায় ধর্মসংস্কার আন্দোলনে রামকৃয়দেবের ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা কর।
উত্তর:
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, তিনি হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব (১৮৩৬-১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ)। সমকালীন সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তিনি সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক অভিনব আদর্শ তুলে ধরেন, যা বাংলার তথা ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন।
সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ: শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মচিন্তার মূল কথা ছিল “যত মত, তত পথ”। তাঁর মতে, সাধনার প্রতিটি পথই সত্য এবং প্রতিটি ধর্মই ঈশ্বরলাভের একেকটি মাধ্যম মাত্র। তিনি নিজে হিন্দু, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের সাধনাপদ্ধতি পালন করে উপলব্ধি করেন যে সব ধর্মের লক্ষ্য একই ঈশ্বর। এইভাবে বৈষ্ণব, শাক্ত, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান — সকল ধর্মাবলম্বীর মধ্যে তিনি এক আধ্যাত্মিক ঐক্যসূত্র স্থাপন করেন।
সহজ-সরল সাধনাপদ্ধতির প্রচার: ঈশ্বরলাভের জন্য জটিল আচার-অনুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ বা শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে মন্ত্র-তন্ত্র, সংসারত্যাগ বা কঠোর শুচিতার পরিবর্তে আন্তরিক ভক্তিই ঈশ্বরপ্রাপ্তির প্রকৃত পথ। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছেও ধর্মসাধনা সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
জীবসেবাই শিবসেবা: রামকৃষ্ণ প্রচার করেন যে জীবের সেবাই প্রকৃত ঈশ্বরসেবা। প্রিয় শিষ্য বিবেকানন্দ যখন নির্বিকল্প সমাধিতে ডুবে থাকতে চেয়েছিলেন, তখন গুরু তাঁকে শেখান যে নিজের মুক্তির চেয়ে দুঃখী মানুষের সেবা অনেক বড়। এই আদর্শই পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাধর্মের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মানবতাবাদ ও সাম্যের বাণী: ধর্মীয় সংকীর্ণতার যুগে দাঁড়িয়ে তিনি মানবমহিমার জয়গান করেন। তাঁর মতে প্রত্যেক মানুষই অনন্ত শক্তির আধার ও ঈশ্বরের সন্তান — পাপী, তাপী, নাস্তিক থেকে পণ্ডিত পর্যন্ত সকলেই চৈতন্যের পথে অগ্রসরমান। এই বাণী সমাজে জাতিভেদ ও ধর্মীয় বিভেদের প্রাচীর অনেকটাই ভেঙে দেয়।
নারীজাতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: তাঁর কাছে নারী ছিল সাক্ষাৎ জগন্মাতার প্রতিরূপ। নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নারীমুক্তির আদর্শকে তিনি আধ্যাত্মিক মর্যাদা দিয়ে সমাজে নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
উপসংহার: শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, “সব মতকে এক একটি পথ বলে জানবে, আমার পথই ঠিক আর সকলের পথ মিথ্যা — এরূপ বিদ্বেষভাব না রাখাই শ্রেয়।” তাঁর এই উদার সর্বধর্মসমন্বয়ী দর্শন উনিশ শতকের বাংলার ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেয় এবং পরবর্তীকালে বিবেকানন্দের নেতৃত্বে রামকৃষ্ণ মিশনের মাধ্যমে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তার লাভ করে।
৫.২ সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী ছিল? এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হল কেন? ৫+৩
উত্তর:
ভূমিকা: পলাশির যুদ্ধের পর বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে কোম্পানির শোষণমূলক রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে যে কৃষক-বিদ্রোহগুলি সংঘটিত হয়, তার মধ্যে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০ খ্রি.) ছিল সর্বাপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ। মূলত দশনামী সন্ন্যাসী, নাগা, গোঁসাই ও মাদারি ফকিররা নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় উচ্ছেদ ও শোষণের শিকার হয়ে এই বিদ্রোহে শামিল হন।
সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
প্রথম কৃষক বিদ্রোহ: কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত এটিই ছিল ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ। প্রায় ৩৭ বছর ধরে অবিরাম চলতে থাকা এই বিদ্রোহের দীর্ঘস্থায়িত্বের নজির পরবর্তী কোনো কৃষক আন্দোলনে দেখা যায়নি।
হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: এই বিদ্রোহে হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকিররা সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেন। কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশীয় স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের অভিন্ন লক্ষ্য, যে কারণে অনেক ঐতিহাসিক একে “স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম” আখ্যা দিয়েছেন।
প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ও গেরিলা কৌশল: অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকের আন্দোলনগুলির মধ্যে এটিই প্রথম সংগঠিত সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যেখানে বিদ্রোহীরা গেরিলা রণকৌশল প্রয়োগ করেন। এই দিক থেকে একে পরবর্তীকালের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনগুলির পথিকৃৎ বলা যায়।
ব্যাপক ভৌগোলিক বিস্তার: স্থানীয় সীমা ছাড়িয়ে এই বিদ্রোহ রংপুর, রামপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, ঢাকা থেকে বীরভূম-বোলপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, ফলে একে প্রকৃত অর্থে “গণবিদ্রোহ” আখ্যা দেওয়া যায়।
সাহিত্যে প্রভাব: এই বিদ্রোহের আদর্শ ও চেতনা পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “আনন্দমঠ” ও “দেবী চৌধুরানী” উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়। “আনন্দমঠ” পরবর্তীকালে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে অন্যতম প্রেরণাস্থল হয়ে ওঠে।
সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার কারণ:
সাংগঠনিক দুর্বলতা: ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও সুযোগ্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব বিদ্রোহকে দুর্বল করে দেয়।
অস্ত্র ও যোগাযোগের ঘাটতি: আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের অভাব এবং বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহী দলগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতা তাদের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষুণ্ণ করে।
ঐক্যের অভাব: বিদ্রোহের শেষদিকে নেতৃত্ব নিয়ে সন্ন্যাসী ও ফকিরদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মতভেদ দেখা দেয়, যা আন্দোলনের গতি ব্যাহত করে।
কোম্পানির কঠোর দমননীতি: গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস দক্ষ সেনানায়ক ও বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন, যার ফলে বিক্ষিপ্ত ও অসংগঠিত বিদ্রোহীরা শেষপর্যন্ত পরাজিত হয়।
উপসংহার: ব্যর্থ হলেও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে এবং পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণাভূমি রচনা করে।
৫.৩ হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ কেন? বাংলা ছাপাখানার বিকাশে চার্লস উইলকিনস-এর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো। ৩+৫
উত্তর:
হ্যালহেডের ‘এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
বাংলা মুদ্রণ ইতিহাসে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত “এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ” (১৭৭৮ খ্রি.) গ্রন্থটি এক যুগান্তকারী সংযোজন। হুগলির অ্যান্ড্রুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে বাংলা হরফে মুদ্রণের প্রথম প্রয়াস দেখা যায়, যদিও মূল রচনা ইংরেজি ভাষায় লেখা।
গ্রন্থটিতে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত এবং ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল ও বিদ্যাসুন্দর থেকে বাংলা হরফে উদ্ধৃতি সন্নিবেশিত হয়, যা বাংলা মুদ্রণশিল্পে সম্পূর্ণ অভিনব। এতেই প্রথম বিচল বা সঞ্চলিত (movable type) বাংলা হরফের ব্যবহার হয়, যা মুদ্রণ প্রযুক্তিতে নতুন যুগের সূচনা করে।
সর্বোপরি, এটিই প্রথম বাংলা গ্রন্থ যা সরকারি উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে, গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত হয়, এমনকি এর কাগজ পর্যন্ত বিলেত থেকে আমদানি করা হয়েছিল।
বাংলা ছাপাখানার বিকাশে চার্লস উইলকিনসের ভূমিকা:
ভূমিকা: বাংলা মুদ্রণশিল্পের প্রকৃত জনক হিসেবে চার্লস উইলকিনসকে (১৭৪৯-১৮৩৬) গণ্য করা হয়। বিলেত থেকে ধাতুনির্মিত অক্ষর তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে তিনিই প্রথম সঞ্চলনযোগ্য বাংলা হরফের নির্মাতা।
দায়িত্ব গ্রহণ: রাজ্যশাসন ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ মুদ্রণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন সিভিলিয়ান তথা প্রখ্যাত বাংলা-সংস্কৃত পণ্ডিত চার্লস উইলকিনসকে।
পঞ্চানন কর্মকারের সহযোগিতা: দক্ষ কারিগর পঞ্চানন কর্মকারের সহায়তায় উইলকিনস ছেনি-কাটা বাংলা হরফ প্রস্তুত করেন, যার ফলে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে অ্যান্ড্রুজের ছাপাখানা থেকে “গ্রামার অব দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ” গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
বহুমুখী প্রতিভা: স্বয়ং হ্যালহেড তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় উইলকিনসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। নকশা খোদাই, মুদ্রাক্ষর ঢালাই এবং মুদ্রণ — এই ত্রিবিধ দায়িত্বই উইলকিনস একক দক্ষতায় সম্পন্ন করেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় বহন করে।
উপসংহার: চার্লস উইলকিনসের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নৈপুণ্যের ফলেই বাংলা ভাষায় প্রথম গ্রন্থ মুদ্রিত হওয়া সম্ভব হয়। বাংলা ও ফারসি মুদ্রণের জন্য ছাপাখানা স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তিনি বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনা জগতে এক বিপ্লব সাধন করেন, যে কারণে তাঁকে যথার্থই “বাংলা মুদ্রণের জনক” আখ্যা দেওয়া হয়।
