তোমরা কি Madhyamik 2024 History Question Paper with Answer খুঁজছো? তাহলে তোমরা একদম সঠিক জায়গায় এসেছো! এই পোস্টে আমরা মাধ্যমিক 2024 ইতিহাস প্রশ্ন এবং সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে তোমরা সহজেই বুঝতে পারো গত বছরের পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন এসেছিল এবং তার সঠিক উত্তর কীভাবে লিখতে হয়। WBBSE বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষকদের মতামত ও ইতিহাসবিদদের তথ্যসূত্র সহকারে তৈরি করা হয়েছে, যা তোমাদের মাধ্যমিক ২০২৭ পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও সাহায্য করবে।
যারা Madhyamik 2024 History Question Paper Solution PDF Download করতে চাও, তাদের জন্য নিচে সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র ও উত্তরমালা PDF আকারে দেওয়া হয়েছে। এই মাধ্যমিক ২০২৪ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমস্ত উত্তর সংগ্রহ করে তোমরা অফলাইনেও প্র্যাকটিস করতে পারবে। প্রতিটি উত্তর MP (Marking Scheme) অনুযায়ী স্টেপ বাই স্টেপ লেখা হয়েছে, যাতে পরীক্ষার হলে নম্বর কাটার কোনো সুযোগ না থাকে। ২ নম্বরের প্রশ্ন থেকে শুরু করে বড় প্রশ্ন পর্যন্ত — সবকিছুই এখানে পাবে একসাথে।
Madhyamik 2024 History Question Paper Solution PDF Download করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তোমরা আগের বছরের প্রশ্নের প্যাটার্ন বুঝে নিজেদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে পারবে। এই মাধ্যমিক ২০২৪ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান শুধু উত্তর মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ, কারণ-ফলাফল এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা তৈরি করার জন্যও অত্যন্ত উপযোগী। যারা মাধ্যমিক পরীক্ষায় ইতিহাসে ভালো নম্বর পেতে চাও, তাদের জন্য এই গাইড একটি সম্পূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
Madhyamik 2024 History Question Paper Solution PDF Download | মাধ্যমিক ২০২৪ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান
বিভাগ – ক
১। সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো: ১×২০=২০
১.১ উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী যুক্ত ছিলেন —
(ক) শহরের ইতিহাসে
(খ) স্থানীয় ইতিহাসে
(গ) শিল্পচর্চার ইতিহাসে
(ঘ) বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিদ্যার ইতিহাসে
উত্তর: (ঘ) বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিদ্যার ইতিহাসে
১.২ ‘নদীয়া কাহিনী’ গ্রন্থটি রচনা করেন —
(ক) নিখিলনাথ রায়
(খ) কুমুদরঞ্জন মল্লিক
(গ) সতীশচন্দ্র মিত্র
(ঘ) কুমুদনাথ মল্লিক
উত্তর: (ঘ) কুমুদনাথ মল্লিক
১.৩ ‘কাউন্সিল অফ এডুকেশন’ গঠিত হয় —
(ক) ১৮১৩ খ্রিঃ
(খ) ১৮২৩ খ্রিঃ
(গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৪২ খ্রিঃ
উত্তর: (ঘ) ১৮৪২ খ্রিঃ
১.৪ গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার রচিত ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয় —
(ক) ১৮১৭ খ্রিঃ
(খ) ১৮২২ খ্রিঃ
(গ) ১৮২৩ খ্রিঃ
(স) ১৮৩৫ খ্রিঃ
উত্তর: (খ) ১৮২২ খ্রিঃ
১.৫ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য ছিলেন —
(ক) স্যার রমেশচন্দ্র মিত্র
(খ) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
(গ) স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) স্যার জেমস উইলিয়াম কোলভিল
উত্তর: (গ) স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
১.৬ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইনের (১৮৭৮ খ্রিঃ) বিরুদ্ধে সংঘটিত আদিবাসী বিদ্রোহটি হল —
(ক) সাঁওতাল হুল
(খ) মুণ্ডা বিদ্রোহ
(গ) কোল বিদ্রোহ
(ঘ) রম্পা বিদ্রোহ
উত্তর: (খ) মুণ্ডা বিদ্রোহ
১.৭ নীলবিদ্রোহের দু’জন উল্লেখযোগ্য নেতা দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষুচরণ বিশ্বাস চৌগাছা গ্রামে বাস করতেন, এটি ছিল —
(ক) পাবনা জেলায়
(খ) খুলনা জেলায়
(গ) নদিয়া জেলায়
(ঘ) ফরিদপুর জেলায়
উত্তর: (গ) নদিয়া জেলায়
১.৮ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘উন্নততর ভারতশাসন আইন’ পাশ করেছিল —
(ক) ১৫ জুলাই, ১৮৫৮ খ্রিঃ
(খ) ২ আগস্ট, ১৮৫৮ খ্রিঃ
(গ) ১০ অক্টোবর, ১৮৫৮ খ্রিঃ
(ঘ) ৫ ডিসেম্বর, ১৮৫৮ খ্রিঃ
উত্তর: (খ) ২ আগস্ট, ১৮৫৮ খ্রিঃ
১.৯ ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল —
(ক) ভারত সভা
(খ) বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা
(গ) ল্যান্ড হোল্ডার্স সোসাইটি
(ঘ) ভারতের জাতীয় কংগ্রেস
উত্তর: (খ) বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা
১.১০ নবগোপাল মিত্র ছিলেন হিন্দুমেলার সভাপতি —
(ক) সভাপতি
(খ) সহ-সভাপতি
(গ) সম্পাদক
(ঘ) সহ-সম্পাদক
উত্তর: (ঘ) সহ-সম্পাদক
১.১১ বসুবিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা জগদীশচন্দ্র বসু, অধ্যাপক ছিলেন —
(ক) গণিত শাস্ত্রের
(খ) রসায়ন শাস্ত্রের
(গ) পদার্থ বিদ্যার
(ঘ) জীববিদ্যার
উত্তর: (গ) পদার্থ বিদ্যার
১.১২ বাংলা ভাষায় প্রথম সচিত্র পুস্তক প্রকাশ করেন —
(ক) উইলিয়ম কেরি
(খ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
(গ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
(ঘ) উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী
উত্তর: (গ) গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য
১.১৩ সর্বভারতীয় কিষাণ সভার প্রথম সভাপতি ছিলেন —
(ক) বাবা রামচন্দ্র
(খ) এন. জি. রঙ্গ
(গ) স্বামী সহজানন্দ
(ঘ) ফজলুল হক
উত্তর: (গ) স্বামী সহজানন্দ
১.১৪ কৃষক আন্দোলনে মতিলাল তেজওয়াত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন —
(ক) বিহারে
(খ) গুজরাটে
(গ) রাজস্থানে
(ঘ) যুক্তপ্রদেশে
উত্তর: (গ) রাজস্থানে
১.১৫ গিরনি কামগড় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল —
(ক) ১৯১৮ খ্রিঃ
(খ) ১৯২২ খ্রিঃ
(গ) ১৯২৮ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৩২ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯২৮ খ্রিঃ
১.১৬ ভারতছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) ভোগেশ্বরী ফুকোননী শহীদ হয়েছিলেন —
(ক) গুজরাটে
(খ) পাঞ্জাবে
(গ) আসামে
(ঘ) উড়িষ্যায়
উত্তর: (খ) পাঞ্জাবে
১.১৭ অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সম্পাদক ছিলেন —
(ক) শচীন্দ্র প্রসাদ বসু
(খ) কৃষ্ণকুমার মিত্র
(গ) চিত্তরঞ্জন দাস
(ঘ) আনন্দমোহন বসু
উত্তর: (ক) শচীন্দ্র প্রসাদ বসু
১.১৮ বীণা দাস বাংলার ছোটোলাট স্ট্যান্লী জ্যাকসনকে হত্যা করার চেষ্টা করেন —
(ক) ১৯২৮ খ্রিঃ
(খ) ১৯৩০ খ্রিঃ
(গ) ১৯৩২ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৩৬ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৩২ খ্রিঃ
১.১৯ স্বাধীন ভারতের প্রথম গান্ধীবাদী শহীদ ছিলেন —
(ক) হৃদয়নাথ কুঞ্জরু
(খ) বল্লভ ভাই প্যাটেল
(গ) পত্তি শ্রীরামালু
(ঘ) পট্টভি সীতারামাইয়া
উত্তর: (গ) পত্তি শ্রীরামালু
১.২০ গোয়া ভারতভুক্ত হয় —
(ক) ১৯৪৭ খ্রিঃ
(খ) ১৯৫৬ খ্রিঃ
(গ) ১৯৬১ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৭১ খ্রিঃ
উত্তর: (গ) ১৯৬১ খ্রিঃ
বিভাগ – খ
২। নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্ততঃ ১টি করে মোট ১৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও): ১×১৬=১৬
উপবিভাগ ২.১
একটি বাক্যে উত্তর দাও: ১×৪=৪
২.১.১ কোন দিনটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস রূপে উদযাপন করা হয়?
উত্তর: ৫ই জুন দিনটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস রূপে উদযাপন করা হয়।
২.১.২ সরকারী নথিপত্র কোথায় সংরক্ষিত হয়?
উত্তর: সরকারী নথিপত্র সংরক্ষিত হয় লেখাগার / মহাফেজখানা
২.১.৩ কোন বছর নারী সত্যাগ্রহ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯৩০ সালে নারী সত্যাগ্রহ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
২.১.৪ বিশ্বভারতী কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
উপবিভাগ ২.২
ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো: ১×৪=৪
২.২.১ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল কৃষকশ্রেণির মধ্যে।
উত্তর: ভুল।
২.২.২ নীলবিদ্রোহের অন্যতম নেতা ছিলেন বিশ্বনাথ সর্দার।
উত্তর: ঠিক।
২.২.৩ ফরাজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দুদুমিঞা।
উত্তর: ভুল।
২.২.৪ ‘দি বেঙ্গলী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
উত্তর: ঠিক।
উপবিভাগ ২.৩
‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও: ১×৪=৪
| ক স্তম্ভ | খ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (১) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট |
| ২.৩.২ নেলী সেনগুপ্ত | (২) সাধারণ জনশিক্ষা কমিটি |
| ২.৩.৩ লর্ড আমহার্স্ট | (৩) হান্টার কমিশন |
| ২.৩.৪ তারকনাথ পালিত | (৪) স্টিমলঞ্চ শ্রমিক ধর্মঘট |
উত্তর:
| ক স্তম্ভ | খ স্তম্ভ |
| ২.৩.১ লর্ড রিপন | (৩) হান্টার কমিশন |
| ২.৩.২ নেলী সেনগুপ্ত | (৪) স্টিমলঞ্চ শ্রমিক ধর্মঘট |
| ২.৩.৩ লর্ড আমহার্স্ট | (২) সাধারণ জনশিক্ষা কমিটি |
| ২.৩.৪ তারকনাথ পালিত | (১) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট |
উপবিভাগ: ২.৪
প্রদত্ত ভারতবর্ষের রেখা মানচিত্রে নিম্নলিখিত স্থানগুলি চিহ্নিত ও নামাঙ্কিত করো: ১×৪=৪
২.৪.১ চুয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-১৭৯৯) এলাকা।
২.৪.২ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র – কানপুর।
২.৪.৩ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) একটি কেন্দ্র – দিল্লী।
২.৪.৪ পুনর্গঠিত রাজ্য – কেরল।
উত্তর:

উপবিভাগ: ২.৫
নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঙ্গে সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচন করো: ১×৪=৪
২.৫.১ বিবৃতি : হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে।
ব্যাখ্যা ১: এটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুশাস্ত্রে শিক্ষাদান করা।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি সহ-শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান।
ব্যাখ্যা ৩: এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছাত্রদের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ছাত্রদের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য।
২.৫.২ বিবৃতি : বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে।
ব্যাখ্যা ১: এটি ছিল কারখানার মালিকশ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির একটি আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল মূলতঃ সরকারি রাজস্ববৃদ্ধির বিরুদ্ধে ধনী কৃষকশ্রেণি ও কৃষিশ্রমিকদের যৌথ আন্দোলন।
ব্যাখ্যা ৩: এটি ছিল ঋণ-দাস কৃষিশ্রমিকদের ধনী কৃষকশ্রেণির শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল মূলতঃ সরকারি রাজস্ববৃদ্ধির বিরুদ্ধে ধনী কৃষকশ্রেণি ও কৃষিশ্রমিকদের যৌথ আন্দোলন।
২.৫.৩ বিবৃতি : দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ছিলেন বাংলার একজন জনপ্রিয় নেতা।
ব্যাখ্যা ১: তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে মেদিনীপুরে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ২: তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ৩: তিনি ছিলেন বাংলায় ভারতছাড়ো আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
উত্তর: ব্যাখ্যা ১: তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে মেদিনীপুরে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
২.৫.৪ বিবৃতি : ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি দিনটি রসিদ আলি দিবস রূপে পালিত হয়।
ব্যাখ্যা ১: রসিদ আলি ছিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের জনৈক শহীদ।
ব্যাখ্যা ২: রসিদ আলি ছিলেন একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা।
ব্যাখ্যা ৩: রসিদ আলি ছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: রসিদ আলি ছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন।
বিভাগ – গ
৩। দু’টি অথবা তিনটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (যে কোনো ১১টি): ২×১১=২২
৩.১ পরিবেশের ইতিহাস বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রকৃতি জগতের সঙ্গে মানবসমাজের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তথা পারস্পরিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিবর্তনের অধ্যয়নকেই পরিবেশের ইতিহাস বলা হয়। এতে বায়ু, জল, অরণ্য, বন্যপ্রাণী প্রভৃতির উপর মানুষের ক্রিয়াকলাপের প্রভাব এবং সময়ের সঙ্গে পরিবেশের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। বিংশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিচার্ড গ্রোভ, রামচন্দ্র গুহ, মাধব গ্যাডগিলের মতো গবেষকদের হাত ধরে এই ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত ঘটে।
৩.২ আধুনিক ভারত ইতিহাসের উপাদানরূপে আত্মজীবনীর গুরুত্ব কী?
উত্তর: আত্মজীবনী হল কোনো ব্যক্তি তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ করা ঘটনার বিবরণ, যা আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান। এতে লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রামাণ্য তথ্য ধরা থাকে, যা সরকারি নথিপত্রে পাওয়া যায় না। যেমন — বিপিনচন্দ্র পালের “সত্তর বৎসর” ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “জীবনস্মৃতি” থেকে সেকালের সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।
৩.৩ আধুনিক ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা-বিস্তারের ক্ষেত্রে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের ৪৩ নং ধারায় ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক অন্তত এক লক্ষ টাকা ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা এর আগে কখনো ঘটেনি। তবে এই অর্থ প্রাচ্য না পাশ্চাত্য শিক্ষায় ব্যয় হবে তা স্পষ্ট না থাকায় প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে ইংরেজি তথা পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়। এই কারণেই ১৮১৩ সালকে সরকারিভাবে শিক্ষা বিস্তারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩.৪ ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিদ্যার ক্ষেত্রে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দ স্মরণীয় কেন?
উত্তর: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাঃ হেনরি গুডিভের নির্দেশনায় প্রথম ভারতীয় হিসেবে শবব্যবচ্ছেদ করেন, যা মহর্ষি সুশ্রুতের প্রায় তিন হাজার বছর পর ঘটে। সমাজের কঠোর ধর্মীয় কুসংস্কার ও জাতিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা করে তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য অ্যানাটমি শিক্ষা ও চিকিৎসাবিদ্যা চর্চার এক নতুন যুগের সূচনা করে।
৩.৫ ‘পাইক’ কাদের বলা হত?
উত্তর: আহোম রাজ্যে রাজবংশীয় সদস্য, পুরোহিত, উচ্চবর্ণের মানুষ ও দাসদের বাদ দিয়ে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী সমস্ত সাধারণ পুরুষকে ‘পাইক’ বলা হত। রাজা ও রাজ্য প্রশাসন এই পাইকদের সেনাবাহিনী, রাস্তাঘাট-মন্দির নির্মাণ ও অন্যান্য নানা রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োগ করত।
৩.৬ ‘হেদায়তী’ নামে কারা পরিচিত ছিল?
উত্তর: বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা তিতুমিরের (প্রকৃত নাম মির নিসার আলি) অনুগামীরা নিজেদের ‘হেদায়তী’ বা ‘সঠিক পথে পরিচালিত’ বলে অভিহিত করতেন। তাঁর এই আন্দোলন ‘তরিকা-ই-মহম্মদিয়া’ বা মহম্মদের পথ নামে পরিচিত ছিল, এবং এই অনুগামীরাই পরবর্তীকালে বারাসাত বিদ্রোহে (১৮৩১) তিতুমিরের সঙ্গে যোগ দেন।
৩.৭ ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটি কীভাবে জাতীয়তাবাদ উন্মেষে সাহায্য করেছিল?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে তিনি পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে দেশবাসীকে আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান, এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেন। সিডিশন কমিশনের রিপোর্টেও (১৯১৮) উল্লেখ আছে যে বিপ্লবীরা তাঁর রচনা নিয়মিত পাঠ করতেন, যা প্রমাণ করে জাতীয়তাবাদ বিকাশে এই গ্রন্থের গভীর প্রভাব ছিল। এই কারণে ঐতিহাসিক আর. জি. প্রধান তাঁকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
৩.৮ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মরণীয় কেন?
উত্তর: বাংলা ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুন শিল্পের ক্ষেত্রে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর ‘খলব্রাহ্মণ’, ‘জাঁতাসুর’, ‘বিরূপ বজ্র’ প্রভৃতি ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজপতিদের ভণ্ডামি-গোঁড়ামি এবং ‘বাবু কালচার’-এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর এই চিত্রগুলি সমকালীন বাঙালিদের মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসনের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা ও জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করেছিল, যে কারণে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
৩.৯ ‘বিদ্যাসাগর সাট’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা মুদ্রণে অক্ষরবিন্যাসের ত্রুটি দূর করার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ছেদ ও যতিচিহ্নসহ বাংলা বর্ণবিন্যাসের এক নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি চার্লস উইলকিনস ও পঞ্চানন কর্মকারের সহযোগিতায় ১২টি স্বরবর্ণ ও ৪০টি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে বাংলা বর্ণমালাকে বৈজ্ঞানিকভাবে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর নামানুসারেই এই পদ্ধতির নাম হয় ‘বিদ্যাসাগর সাট’।
৩.১০ বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসে বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব কী?
উত্তর: কলকাতার আপার চিৎপুর রোড অঞ্চলে (দর্জিপাড়া, শ্যামবাজার, জোড়াসাঁকো, শিয়ালদহ) উনিশ শতকে জনরুচি অনুযায়ী যেসব প্রকাশনা গড়ে ওঠে, তা ‘বটতলা প্রকাশনা’ নামে পরিচিত। এখানে ব্রতকথা, পাঁচালি, পুঁথি, রসালো কাহিনি, সমসাময়িক ঘটনা প্রভৃতি নিয়ে লেখা বই সস্তায় ছাপা হত। স্বদেশী কারিগরি দক্ষতা ও সস্তা কাগজের ব্যবহারে এই বইয়ের দাম কম থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়, ফলে উনিশ শতকে জনশিক্ষার বিস্তারে বটতলা প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩.১১ কৃষক আন্দোলনে বাবা রামচন্দ্রের কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: বাবা রামচন্দ্র (আসল নাম শ্রীধর বলবন্ত জোধপুরকর) ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনকালে যুক্তপ্রদেশের অযোধ্যা অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও তালুকদারদের অতিরিক্ত খাজনা আদায়, বেগার শ্রম ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ‘অযোধ্যা কিষান সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষকরা খাজনা বন্ধ ও অত্যাচারী জমিদারদের সামাজিক বয়কটের ডাক দেয়, যার ফলে সরকার সংশোধিত অযোধ্যা আইন পাস করতে বাধ্য হয়।
৩.১২ সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরোধিতা করে শ্রমিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন। এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকা বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে শ্রমিক শ্রেণিকে সর্বভারতীয় ভিত্তিতে সংগঠিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত হয় এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম আরও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
৩.১৩ জাতীয় আন্দোলনে সরলাদেবী চৌধুরাণীর কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: সরলাদেবী চৌধুরাণী স্বদেশি ও জাতীয় আন্দোলনে যুবশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ এবং ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ প্রচলন করেন এবং স্বদেশি দ্রব্যের প্রচারে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রতিষ্ঠা করেন। নারীজাগরণের লক্ষ্যে তিনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’ নামে ভারতের প্রথম মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৩.১৪ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির কীরূপ ভূমিকা ছিল?
উত্তর: চট্টগ্রামের শিক্ষক মাস্টারদা সূর্য সেন তাঁর ছাত্র ও সহযোগীদের (অম্বিকা চক্রবর্তী, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, লোকনাথ বল প্রমুখ) নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ নামে একটি সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের সদস্যরা ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে টেলিফোন-টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং সাময়িকভাবে ‘স্বাধীন বিপ্লবী সরকার’ ঘোষণা করেন। এই ঘটনা সমগ্র ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়।
৩.১৫ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘ভারতের লৌহমানব’ কেন বলা হয়?
উত্তর: স্বাধীনতার পর ভারতে প্রায় ৫৬২টি দেশীয় রাজ্য ছিল, যাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশীয় রাজ্য দপ্তরের প্রধান সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কূটনীতি, দৃঢ়তা ও প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রায় সবকটি দেশীয় রাজ্যকে ভারত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। জাতীয় সংহতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই অসাধারণ ভূমিকার জন্যই তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ (Iron Man of India) বলা হয়।
৩.১৬ উদ্বাস্তু সমস্যা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের ফলে সৃষ্ট সমস্যাকে উদ্বাস্তু সমস্যা বলা হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যক হিন্দু, মুসলিম ও শিখ জনগোষ্ঠী নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও পরিচয় হারিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয় পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে সরকারকে উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিরাট প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
বিভাগ – ঘ
৪। সাত বা আটটি বাক্যে যে কোনো ৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্ততঃ ১টি করে প্রশ্নের উত্তর দাও): ৪×৬=২৪
উপবিভাগ: ঘ.১
৪.১ উনিশ শতকের বাংলায় নারীসমাজের বিকাশে ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’র ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলায় স্ত্রীশিক্ষার প্রতি সমাজের বিশেষ সমর্থন ছিল না। এই পরিস্থিতিতে নারীদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা প্রসারের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মনেতা উমেশচন্দ্র দত্ত কয়েকজন তরুণ ব্রাহ্মকে নিয়ে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ‘বামাবোধিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই সভার মুখপত্র হিসেবে সেই বছরই আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয় ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’।
নারীসমাজের বিকাশে এই পত্রিকার ভূমিকা:
১. নারীশিক্ষার প্রচার: পত্রিকাটি নিয়মিতভাবে ধর্ম, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, গৃহচিকিৎসা ও শিশুপালন সংক্রান্ত প্রবন্ধ প্রকাশ করে গৃহবধূদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করে, যা তখনকার সমাজে এক নতুন প্রয়াস ছিল।
২. সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচার: এই পত্রিকা বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, পণপ্রথা প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং সমাজে এসবের কুফল তুলে ধরে জনমত গঠনে সাহায্য করে।
৩. নারীদের লেখনীর সুযোগদান: লাবণ্যপ্রভা বসু, স্বর্ণপ্রভা বসুর মতো বহু নারী এই পত্রিকায় স্বনামে বা বেনামে লেখালেখি করতেন, যা নারীদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
৪. আদর্শ স্থাপন: পত্রিকাটি গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো প্রাচীন বিদুষী নারীদের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বাঙালি নারীদের শিক্ষালাভে উৎসাহিত করত।
সামগ্রিকভাবে, ১৮৬৩ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ষাট বছর ধরে প্রকাশিত হওয়া ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ উনিশ শতকের বাংলার নারীসমাজের অবস্থা, তাদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪.২ ধর্মসংস্কার আন্দোলনে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের ধর্মসংস্কার আন্দোলনে স্বামী বিবেকানন্দ (নরেন্দ্রনাথ দত্ত) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
১. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামঞ্জস্যবাদ: তিনি বেদান্ত দর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মনে করতেন প্রতিটি ধর্মই সত্যে পৌঁছানোর একটি পথমাত্র, তাই সব ধর্মের মধ্যে সহাবস্থান জরুরি।
২. বিশ্বমঞ্চে হিন্দুধর্মের প্রচার: ১৮৯৩ সালে শিকাগো বিশ্বধর্ম সম্মেলনে ভাষণ দিয়ে তিনি হিন্দুধর্মের উদার ও বিশ্বজনীন রূপ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।
৩. কুসংস্কার ও জাতিভেদের বিরোধিতা: তিনি জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ও ধর্মীয় কুসংস্কারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং ধর্মকে আচার-অনুষ্ঠানের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানান।
৪. মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা: তাঁর মতে দরিদ্র নারায়ণের সেবাই প্রকৃত ধর্মাচরণ, অর্থাৎ মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করে সেবা করাই প্রকৃত ধর্ম।
৫. যুবসমাজ ও আত্মশক্তির আহ্বান: তিনি যুবসমাজকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাতি গঠনে এগিয়ে আসার ডাক দেন এবং নারীশিক্ষা ও নারীর মর্যাদার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন।
৬. বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে সামঞ্জস্য: তিনি ধর্মকে কুসংস্কারমুক্ত করে যুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেন।
৭. রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা: এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই তিনি ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা সেবা ও শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের কাজ চালিয়ে যায়।
উপসংহার: সব মিলিয়ে, বিবেকানন্দের চিন্তাধারা হিন্দুধর্মের আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ ঘটানোর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনা গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উপবিভাগ: ঘ.২
৪.৩ মহাবিদ্রোহ (১৮৫৭) কে কী ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ বলা যেতে পারে?
উত্তর:
ভূমিকা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের এক ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান। ঐতিহাসিক ড. এস. এন. সেন সহ কয়েকজন ঐতিহাসিক একে আংশিকভাবে ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এতে পদচ্যুত রাজা-জমিদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ বলার পক্ষে যুক্তি:
১. স্বত্ববিলোপ নীতির প্রভাব: লর্ড ডালহৌসির ‘ডকট্রিন অব ল্যাপস’ নীতির ফলে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, নানাসাহেব, আওধের ওয়াজিদ আলি শাহ প্রমুখ শাসক তাঁদের রাজ্য ও ক্ষমতা হারান, ফলে তাঁরা বিদ্রোহে যোগ দেন।
২. সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা: বিদ্রোহীরা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে, যা প্রমাণ করে বিদ্রোহের একটি লক্ষ্য ছিল পুরাতন সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
৩. তালুকদার ও জমিদারদের অংশগ্রহণ: আওধ অঞ্চলে ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ নীতির ফলে ক্ষুব্ধ তালুকদাররা বিদ্রোহে ব্যাপকভাবে যোগ দেন, যা এই বিদ্রোহকে সামন্ততান্ত্রিক চরিত্র প্রদান করে।
বিরুদ্ধ যুক্তি (সীমাবদ্ধতা):
৪. জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণ: কৃষক, তাঁতি, সিপাহি ও সাধারণ মানুষও এই বিদ্রোহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়, যা প্রমাণ করে এটি কেবল সামন্তশ্রেণির স্বার্থরক্ষার আন্দোলন ছিল না।
৫. বহুমুখী কারণ: অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় হস্তক্ষেপ (এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক), এবং সামাজিক অসন্তোষও এই বিদ্রোহের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যা নিছক সামন্ততান্ত্রিক ব্যাখ্যাকে খণ্ডন করে।
উপসংহার: সুতরাং, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে সামন্ততান্ত্রিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও, একে সম্পূর্ণরূপে ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ বলা যথাযথ নয়, কারণ এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা, ধর্মীয়-সামাজিক ক্ষোভ এবং জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও সমানভাবে বিদ্যমান ছিল।
৪.৪ উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদের বিকাশে ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির অবদান কী ছিল?
উত্তর:
ভূমিকা: উনিশ শতকের শেষভাগে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে বিভিন্ন প্রতীকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ‘ভারতমাতা’ চিত্র। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতার প্রতিকৃতি অঙ্কন করেন, যা ভারতকে এক মাতৃমূর্তি রূপে কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নতুন মাত্রা দেয়।
১. বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে ভারতমাতার চিত্র জনমানসে গভীর দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহার ও বিদেশি পণ্য বর্জনের আদর্শ প্রচারে সহায়ক হয়।
২. জাতীয় ঐক্যের প্রতীক: ভারতকে মাতৃরূপে কল্পনা করার মাধ্যমে এই চিত্র ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীকে এক অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের অধীনে সংগঠিত করার প্রেরণা জোগায়।
৩. বিপ্লবীদের শক্তির উৎস: ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতমাতার চিত্র অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাছে মাতৃভূমিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞায় অনুপ্রেরণা জোগায়।
৪. সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে প্রসার: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম্’ গানের ভাবধারার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে এই চিত্র সাহিত্য, সংগীত ও চিত্রকলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেয়।
উপসংহার: সব মিলিয়ে, ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি কেবল একটি শৈল্পিক সৃষ্টি ছিল না, বরং তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী মানসিক প্রতীকে পরিণত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছিল।
উপবিভাগ: ঘ.৩
৪.৫ একা আন্দোলনের একটি সমালোচনামূলক বিবরণ দাও।
উত্তর:
ভূমিকা:
অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন ১৯২১ সালের শেষ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) উত্তর-পশ্চিম অযোধ্যা অঞ্চলের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর ও বারাইচ জেলায় কৃষকদের নিয়ে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ‘একা আন্দোলন’ নামে পরিচিত।
১. নামকরণ ও কারণ:
রেকর্ডভুক্ত খাজনার অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ কর আদায়, বেগার শ্রম ও জমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ (একতা) থাকার শপথ নেওয়ায় এই আন্দোলনের নাম হয় ‘একা আন্দোলন’।
২. নেতৃত্ব ও কর্মসূচি:
মাদারি পাশি ও বাবা গরিবদাসের নেতৃত্বে কৃষকরা শপথ নেয় — নথিভুক্ত খাজনার বেশি দেবে না, রসিদ ছাড়া খাজনা দেবে না, বেগার শ্রম দেবে না এবং জমি থেকে উৎখাত হলেও জমি ছাড়বে না।
৩. কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ (সমালোচনার প্রথম দিক):
প্রাথমিক পর্যায়ে কংগ্রেস ও খিলাফতি নেতাদের প্রভাব থাকলেও মাদারি পাশির মতো অনগ্রসর শ্রেণির নেতৃত্বে আন্দোলন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে নিজস্ব পথে চলতে শুরু করে, ফলে জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।
৪. সাংগঠনিক দুর্বলতা (সমালোচনার দ্বিতীয় দিক):
আন্দোলনটি ছিল মূলত স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিত, এর কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না এবং এটি অযোধ্যার সীমিত অঞ্চলেই আবদ্ধ থেকে যায়, সর্বভারতীয় রূপ নিতে পারেনি।
৫. দমন ও পরিণতি:
১৯২২ সালের জুন মাসে সরকার মাদারি পাশিকে গ্রেপ্তার করে কঠোর দমননীতির মাধ্যমে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয়।
উপসংহার:
একা আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং কংগ্রেসের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তবুও এটি অযোধ্যার প্রান্তিক কৃষক সমাজের মধ্যে ঐক্য ও প্রতিরোধের চেতনা জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছিল।
৪.৬ কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর:
ভূমিকা:
বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একটি বামপন্থী তথা সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল (Congress Socialist Party) প্রতিষ্ঠিত হয়।
১. রুশ বিপ্লবের প্রভাব:
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ও সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সাফল্য ভারতীয় তরুণ কংগ্রেস কর্মীদের সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট করে।
২. আইন অমান্য আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা:
১৯৩০-৩৪ সালের আইন অমান্য আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় এবং গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে (১৯৩১) হতাশ হয়ে বামপন্থী কর্মীরা গান্ধিবাদী পদ্ধতির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন।
৩. শ্রমিক-কৃষকের প্রতি কংগ্রেস নেতৃত্বের ঔদাসীন্য:
কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব শ্রমিক-কৃষকদের অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে যথেষ্ট সক্রিয় না হওয়ায় একাংশ কর্মী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
৪. কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব:
সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে (১৯৩৪) কমিউনিস্ট নেতারা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক মঞ্চ ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন।
৫. নেহরু ও সুভাষচন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব:
জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বামপন্থী চিন্তাধারাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
দল গঠন:
১৯৩৪ সালে জেলমুক্তির পর জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্যোগে পাটনায় প্রথম সাংগঠনিক সভা হয়, এবং সেই বছরই ২৩ অক্টোবর বোম্বাইয়ে আচার্য নরেন্দ্র দেবের সভাপতিত্বে ও জয়প্রকাশ নারায়ণকে সাধারণ সম্পাদক করে আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। রামমনোহর লোহিয়া, অচ্যুত পট্টবর্ধন, মিনু মাসানি প্রমুখ ছিলেন এই দলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নেতা।
উপসংহার:
কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একটি সংগঠিত বামপন্থী ধারা তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে ভারতছাড়ো আন্দোলনেও (১৯৪২) সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
উপবিভাগ: ঘ.৪
৪.৭ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
ভূমিকা:
অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতার পর বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (বি.ভি. দল) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১. প্রতিষ্ঠা:
হেমচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক পূর্বপ্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী দলকে ভিত্তি করে ১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স পুনর্গঠিত হয়, যার প্রধান পরিচালক ছিলেন মেজর সত্য গুপ্ত।
২. অলিন্দ যুদ্ধ — রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ (১৯৩০):
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বি.ভি. দলের সদস্য বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ঢুকে কারা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন, যা ইতিহাসে ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
৩. আত্মত্যাগ:
পুলিশ ঘিরে ফেললে বাদল গুপ্ত আত্মহত্যা করেন, বিনয় বসু হাসপাতালে মারা যান, এবং দীনেশ গুপ্তকে ১৯৩১ সালে ফাঁসি দেওয়া হয় — এই ঘটনা সারা দেশে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
৪. পূর্বসূরি ঘটনা:
এর আগে ১৯৩০ সালের আগস্টে বিনয় বসু ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে ঢুকে পুলিশ অফিসার লোম্যানকে হত্যা করেছিলেন, যা বি.ভি. দলের আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল।
৫. ব্রিটিশ দমননীতি:
রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণের পর ব্রিটিশ সরকার ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে বি.ভি. দলের কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করে।
উপসংহার:
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দল রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মত্যাগের আদর্শ ও বৈপ্লবিক চেতনা জাগিয়ে তোলে, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
৪.৮ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:
ভূমিকা:
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে বাংলার ছাত্রসমাজ এক মুখ্য ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১. স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনে অংশগ্রহণ:
ছাত্ররা বিদেশি পণ্য বর্জন করে স্বদেশি দ্রব্যের প্রচারে ঘরে ঘরে ও মেলায় গিয়ে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করে।
২. কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিবাদ ও জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন:
ছাত্রদের আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে সরকার কার্লাইল সার্কুলার (১০ অক্টোবর ১৯০৫) জারি করলে তার প্রতিবাদে ছাত্ররা স্কুল-কলেজ বর্জন করে, এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ১৯০৬ সালের ১১ মার্চ গঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, যার সভাপতি পরে হন রাসবিহারী ঘোষ।
৩. জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় ‘বঙ্গ জাতীয় বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ (প্রথম অধ্যক্ষ অরবিন্দ ঘোষ) ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠে।
৪. বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা:
ছাত্ররা রাস্তায় নেমে মিছিল, সভা ও পিকেটিং করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং আন্দোলনকে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেয়।
৫. বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ:
অনেক ছাত্র যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেয়; ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি মুজফফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টা করেন।
৬. ব্রিটিশ দমননীতি:
আন্দোলনরত বহু ছাত্র গ্রেপ্তার, বহিষ্কার ও অত্যাচারের শিকার হন, যা তাঁদের আত্মত্যাগের প্রমাণ বহন করে।
উপসংহার:
ছাত্রসমাজের এই ব্যাপক আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ফলে আন্দোলন এমন ব্যাপকতা লাভ করে যে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়, এবং এই আন্দোলনই পরবর্তী জাতীয় সংগ্রামে ছাত্রসমাজের সক্রিয় ভূমিকার ভিত্তি স্থাপন করে।
বিভাগ – ঙ
৫। পনেরো বা ষোলটি বাক্যে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৮×১=৮
৫.১ বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। বিদ্যাসাগর কতটা সাফল্য অর্জন করেছিলেন? (৫+৩)
উত্তর:
ভূমিকা:
উনিশ শতকের বাংলায় কৌলীন্য প্রথার ফলে বহু অল্পবয়সী মেয়ে বিধবা হয়ে সমাজের নিষ্ঠুর বিধিনিষেধের শিকার হতো। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন।
বিধবা বিবাহ আন্দোলনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা:
শাস্ত্রীয় যুক্তি উপস্থাপন:
তিনি ‘পরাশর সংহিতা’র উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে হিন্দুশাস্ত্রে বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, এবং রক্ষণশীল পণ্ডিতদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় বিতর্কে অবতীর্ণ হন।
জনমত গঠন:
তিনি ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা’ ও ‘আবার অতি অল্প হইল’ প্রভৃতি পুস্তিকা রচনা করে জনমত গঠন করেন।
আইন প্রণয়নে উদ্যোগ:
তাঁর আবেদনের ফলে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই ‘হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ (Act XV of 1856) পাশ হয়।
প্রথম বিধবাবিবাহ:
১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে দশ বছরের বিধবা কালীমতি দেবীর বিবাহ দিয়ে তিনি এই আন্দোলনের সূচনা করেন।
ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত স্থাপন:
১৮৭০ সালে তিনি নিজের পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে ভবসুন্দরী নামে এক বিধবার বিবাহ দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আর্থিক ত্যাগ:
১৮৫৬ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে তিনি নিজের ৮২ হাজার টাকা ব্যয় করে প্রায় ৬০টি বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন।
দরিদ্র বিধবাদের সহায়তা:
দরিদ্র বিধবাদের সাহায্যের জন্য ১৮৭২ সালে তিনি ‘হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন।
সাফল্যের দিক:
১. বিধবা বিবাহ আইনি স্বীকৃতি পায়, যা সামাজিক সংস্কারের ইতিহাসে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
২. বিনয় ঘোষের মতে এটি ছিল উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন।
৩. বাংলার বাইরে বোম্বাই প্রার্থনা সমাজ, মহারাষ্ট্রে ডি. কে. কার্ভে, মাদ্রাজে বীরসালিঙ্গম পান্তুলুর মতো সংস্কারকরাও অনুপ্রাণিত হয়ে বিধবাবিবাহ আন্দোলন চালিয়ে যান।
সীমাবদ্ধতা/আংশিক ব্যর্থতা:
১. আইন পাশ হলেও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের অধিকাংশ এই প্রথা মেনে নেয়নি, ফলে বিধবাবিবাহের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিতই থেকে যায়।
২. কিছু পুরুষ অর্থলোভে বিধবা বিবাহ করে পরে দ্বিতীয় আরেকটি বিবাহ করতে থাকেন, ফলে বহুবিবাহ সমস্যা নতুন রূপে দেখা দেয়, যা রোধে বিদ্যাসাগরকে বাড়তি উদ্যোগ নিতে হয়।
৩. এই আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর আর্থিকভাবে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।
৪. সমাজের রক্ষণশীল অংশ থেকে বিধবাবিবাহে অংশগ্রহণকারীরা দীর্ঘদিন সামাজিক বয়কট ও কটূক্তির শিকার হতে থাকেন।
উপসংহার:
বিদ্যাসাগরের আন্দোলন আইনি সাফল্য পেলেও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবুও তাঁর এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের নারী স্বাধীনতা ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে, এবং আজকের ভারতীয় সমাজে বিধবাবিবাহ যে স্বাভাবিক ঘটনা, তা মূলত বিদ্যাসাগরেরই ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার ফসল।
৫.২ ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলতে কী বোঝায়? উনিশ শতকের বাংলায় রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে হিন্দুমেলার কীরূপ অবদান ছিল? (৩+৫)
উত্তর:
‘সভা-সমিতির যুগ’ বলতে কী বোঝায়?
ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্যোগে একের পর এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সভা-সমিতি (যেমন — বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, হিন্দুমেলা, ভারতসভা) প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, যেগুলি সরকারের কাছে ভারতীয়দের দাবিদাওয়া পেশ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারের কাজ করে। ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল তাঁর ‘The Emergence of Indian Nationalism’ গ্রন্থে ১৮৫৭ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এই সময়কালকে ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এই সভাসমিতিগুলিই পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি করে।
উনিশ শতকের বাংলায় রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে হিন্দুমেলার অবদান:
ভূমিকা:
১৮৬৭ সালের ১২ এপ্রিল (চৈত্র সংক্রান্তি) নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে ও রাজনারায়ণ বসুর অনুপ্রেরণায় কলকাতায় হিন্দুমেলা (আদি নাম চৈত্রমেলা) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার প্রথম সম্পাদক ছিলেন গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১. জাতীয়তাবোধের জাগরণ:
হিন্দুমেলার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতবাসীর মধ্যে, বিশেষত বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা।
২. দেশাত্মবোধক সাহিত্য ও সংগীতের প্রচার:
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গাও ভারতের জয়’ গানের মতো দেশাত্মবোধক কবিতা-গান রচিত ও প্রচারিত হয়, যা পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’-এর মতো রচনার পথ প্রশস্ত করে।
৩. আত্মনির্ভরতা ও শরীরচর্চার প্রসার:
নবগোপাল মিত্র প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল জিমনেশিয়াম’-এর মাধ্যমে লাঠিখেলা, কুস্তির মতো দেশীয় ক্রীড়ার প্রসার ঘটিয়ে যুবসমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা হয়।
৪. স্বদেশি ভাবধারার সূচনা:
দেশীয় শিল্প, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচারের মাধ্যমে হিন্দুমেলা পরবর্তী স্বদেশি আন্দোলনের (১৯০৫) প্রেরণা জোগায়।
সীমাবদ্ধতা:
সমালোচকদের মতে হিন্দুমেলার উদ্যোক্তারা ‘বাঙালি হিন্দু’ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি, ফলে মুসলিম সম্প্রদায়কে এই জাতীয়তাবাদী চেতনার আওতায় আনা যায়নি।
উপসংহার:
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হিন্দুমেলার কার্যপদ্ধতি পরবর্তীকালের স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনকে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং বাংলায় সংগঠিত জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
৫.৩ বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। (৮)
উত্তর:
ভূমিকা:
পূর্ববঙ্গের ঢাকা, খুলনা, যশোহর, ফরিদপুর ও বাখরগঞ্জ অঞ্চলের কৃষিজীবী নমঃশূদ্র (পূর্বনাম চণ্ডাল) সম্প্রদায় বর্ণহিন্দুদের সামাজিক বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ১৮৭২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তা নমঃশূদ্র বা মতুয়া আন্দোলন নামে পরিচিত।
১. হরিচাঁদ ঠাকুর ও মতুয়া ধর্মের প্রতিষ্ঠা:
ফরিদপুরের ওড়াকান্দি গ্রামে হরিচাঁদ ঠাকুর ‘মতুয়া’ ধর্মমত প্রচার করে নমঃশূদ্রদের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐক্যের সূত্রে বাঁধেন, এবং “মনুষ্যত্বই ধর্ম” আদর্শে জাতিভেদের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলেন।
২. গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন:
হরিচাঁদের পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর শিক্ষাকে হাতিয়ার করে নমঃশূদ্রদের আত্মনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. সাংগঠনিক রূপ লাভ:
১৯০২ সালে ‘উন্নয়নী সভা’ এবং ১৯১২ সালে ‘বেঙ্গল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্দোলন সংগঠিত রূপ লাভ করে।
৪. ‘নমঃশূদ্র’ নামের স্বীকৃতি:
গুরুচাঁদ ঠাকুরের দাবির ভিত্তিতে ১৯১১ সালের জনগণনায় ‘চণ্ডাল’-এর পরিবর্তে ‘নমঃশূদ্র’ নামটি সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়।
৫. রাজনৈতিক অধিকারের দাবি:
১৯১৬ (ঢাকা) ও ১৯১৭ (কলকাতা) সালের সম্মেলনে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানানো হলে ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারে বঙ্গীয় আইনসভায় অনুন্নত শ্রেণির জন্য একটি প্রতিনিধি মনোনয়নের ব্যবস্থা করা হয়।
৬. পরবর্তী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সংযোগ:
গুরুচাঁদের মৃত্যুর পর প্রমথরঞ্জন ঠাকুর ও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে নমঃশূদ্ররা ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি সমর্থন করে এবং কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়; ১৯৩৮ সালে তাঁরা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিডিউল কাস্ট পার্টি’ গঠন করেন।
৭. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নেতা:
মুকুন্দবিহারী মল্লিক, রাজেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও বিরাটচন্দ্র মণ্ডলও এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
উপসংহার:
হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে তোলে এবং বাংলার দলিত আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
