Madhyamik 2026 History Question Paper Solution | মাধ্যমিক ২০২৬ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান

Share This Awesome Post 😊

তোমরা কি Madhyamik 2026 History Question Paper Solution খুঁজছো? তাহলে তোমরা একদম সঠিক জায়গায় এসেছো! এই পোস্টে আমরা তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছি মাধ্যমিক ২০২৬ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান, যেখানে WBBSE বোর্ডের নির্ধারিত মার্কিং স্কিম অনুযায়ী প্রতিটি প্রশ্নের নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ উত্তর তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য, সাল-তারিখ এবং বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণ সহকারে লেখা এই উত্তরগুলো তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও নির্ভুল ও শক্তিশালী করে তুলবে।

যারা Madhyamik History Question Paper 2026 Solved সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাও, তাদের জন্য এই পোস্টে প্রতিটি প্রশ্নের ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্র ২০২৬ সমাধান | WBBSE অনুযায়ী তৈরি এই উত্তরমালায় MCQ, SAQ, ২ নম্বরের প্রশ্ন থেকে শুরু করে বড় বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন পর্যন্ত সবকিছু কভার করা হয়েছে, যাতে তোমরা খাতায় সঠিক ফরম্যাটে ও পূর্ণ নম্বর পাওয়ার মতো উত্তর লিখতে পারো।

Madhyamik 2026 History Question Paper Solution নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করলে তোমরা প্রশ্নের প্যাটার্ন, গুরুত্বপূর্ণ টপিক এবং উত্তর লেখার সঠিক কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। এই গাইড শুধু তথ্য মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে যুক্তিসঙ্গতভাবে উত্তর লেখার দক্ষতা তৈরি করার জন্যও তৈরি করা হয়েছে। মাধ্যমিক ২০২৬ পরীক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি সম্পূর্ণ, নির্ভরযোগ্য ও আপডেটেড রেফারেন্স, যা ইতিহাসে ভালো নম্বর তুলতে সহায়ক হবে।

WhatsApp Channel
WhatsApp Channel (মাধ্যমিক) Join Now
Telegram Channel
Telegram Channel (মাধ্যমিক) Join Now
YouTube Channel
YouTube Channel (মাধ্যমিক) Subscribe

Madhyamik 2026 History Question Paper Solution PDF Download | মাধ্যমিক ২০২৬ ইতিহাস প্রশ্নপত্রের সমাধান

(ক) ২০টি
(খ) ২৫টি
(গ) ৩০টি
(ঘ) ৫০টি

উত্তর: (গ) ৩০টি

(ক) বিপিনচন্দ্র পাল
(খ) সরলাদেবী চৌধুরানী
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উত্তর: (ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(ক) ১৮১৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮২০ খ্রিঃ
(গ) ১৮২৩ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮২৮ খ্রিঃ

উত্তর: (ঘ) ১৮২৮ খ্রিঃ

(ক) শিবনাথ শাস্ত্রী
(খ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) উমেশচন্দ্র দত্ত
(ঘ) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ

উত্তর: (গ) উমেশচন্দ্র দত্ত

(ক) ১৮২৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮৩০ খ্রিঃ
(গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৪০ খ্রিঃ

উত্তর: (গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ

(ক) ১৮৬৫ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭০ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৮ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৮০ খ্রিঃ

উত্তর: (ক) ১৮৬৫ খ্রিঃ

(ক) কোল বিদ্রোহের (১৮৩১-‘৩২)
(খ) সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-‘৫৬)
(গ) মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০)
(ঘ) চুয়াড় বিদ্রোহের (১৯৯৮-‘৯৯)

উত্তর: (গ) মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০)

(ক) ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার
(খ) ডিরোজিও
(গ) ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন
(ঘ) ডঃ অনিল শীল

উত্তর: (ঘ) ডঃ অনিল শীল

(ক) ১৮৭০ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭২ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৭৬ খ্রিঃ

উত্তর: (গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ

(ক) ১৮৬৭ খ্রিঃ
(খ) ১৮৭২ খ্রিঃ
(গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
(ঘ) ১৮৭৬ খ্রিঃ

উত্তর: (ক) ১৮৬৭ খ্রিঃ

(ক) সত্যেন্দ্রনাথ বসু
(খ) রাসবিহারী বসু
(গ) জগদীশচন্দ্র বসু
(ঘ) কাদম্বিনী বসু

উত্তর: (গ) জগদীশচন্দ্র বসু

(ক) পঞ্চানন কর্মকার
(খ) উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী
(গ) চার্লস উইলকিন্স
(ঘ) সুকুমার রায়

উত্তর: (খ) উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী

(ক) মতিলাল নেহরু
(খ) তেজবাহাদুর সাপ্রু
(গ) বল্লভভাই প্যাটেল
(ঘ) লালা লাজপত রায়

উত্তর: (ঘ) লালা লাজপত রায়

(ক) মাদ্রাজে
(খ) মালাবার উপকূলে
(গ) পঞ্জাবে
(ঘ) গুজরাটে

উত্তর: (ঘ) গুজরাটে

(ক) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত
(খ) রাসবিহারী বসু
(গ) চিত্তরঞ্জন দাশ
(ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল

উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল

(ক) ছাত্র আন্দোলনে
(খ) নারী আন্দোলনে
(গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে

উত্তর: (গ) বিপ্লবী আন্দোলনে

(ক) অসহযোগ আন্দোলনে
(খ) আইন-অমান্য আন্দোলনে
(গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
(ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে

উত্তর: (ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে

(ক) জ্যোতিবা ফুলে
(খ) নারায়ন গুরু
(গ) ডঃ আম্বেদকর
(ঘ) গান্ধিজি

উত্তর: (ঘ) গান্ধিজি

(ক) ১৯৪৮ খ্রিঃ
(খ) ১৯৫৪ খ্রিঃ
(গ) ১৯৬১ খ্রিঃ
(ঘ) ১৯৭১ খ্রিঃ

উত্তর: (গ) ১৯৬১ খ্রিঃ

(ক) জয়পুর রাজ্যের
(খ) কাশ্মীর রাজ্যের
(গ) পাতিয়ালা রাজ্যের
(ঘ) জুনাগড় রাজ্যের

উত্তর: (খ) কাশ্মীর রাজ্যের

উত্তর: ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

উত্তর: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন।

উত্তর: মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয় ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে।

উত্তর: ‘মতুয়া’ ধর্মমতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর।

উত্তর: ঠিক

উত্তর: ভুল

উত্তর: ভুল

উত্তর: ঠিক

উত্তর:

‘ক’ স্তম্ভ‘খ’ স্তম্ভ
(২.৩.১) বল্লভভাই প্যাটেল(৪) বারদৌলি আন্দোলন
(২.৩.২) ডঃ বি. আর. আম্বেদকর(৩) দলিত আন্দোলন
(২.৩.৩) রসিদ আলি(২) ছাত্র আন্দোলন
(২.৩.৪) মেজর জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরী (১) হায়দ্রাবাদ

উত্তর:

Madhyamik History Question Paper 2026 Map Pointing
Madhyamik 2026 History Question Paper Map Pointing

ব্যাখ্যা ১ : তিনি ছিলেন কাউন্সিল অব এডুকেশনের সভাপতি।

ব্যাখ্যা ২ : তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি।

ব্যাখ্যা ৩ : তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২ : তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি।

ব্যাখ্যা ১ : এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসীদের মঙ্গল সাধন করা।

ব্যাখ্যা ২ : এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা।

ব্যাখ্যা ৩ : এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা।

উত্তর: ব্যাখ্যা ৩ : এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা।

ব্যাখ্যা ১ : তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা।

ব্যাখ্যা ২ : তিনি ছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ে নোবেল পুরষ্কারজয়ী প্রথম ভারতীয়।

উত্তর: ব্যাখ্যা ৩ : তিনি ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস্-এর প্রতিষ্ঠাতা।

ব্যাখ্যা ১ : এটি ছিল শিল্প শ্রমিকের বিদ্রোহ।

ব্যাখ্যা ২ : এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।

ব্যাখ্যা ৩ : এটি ছিল একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ।

উত্তর: ব্যাখ্যা ২ : এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।

উত্তর: সরকারি নথিপত্র মূলত ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত হওয়ায় এতে তাদের স্বার্থরক্ষা ও শাসনকে যুক্তিসংগত প্রতিপন্ন করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, ফলে ইতিহাসের নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শ্রমিকদের প্রকৃত অনুভূতি এবং আন্দোলনের যথার্থ রূপ এসব নথিতে অনেক সময় উপেক্ষিত বা বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়। এছাড়া শাসকের অত্যাচার ও শোষণের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ‘গোপনীয়’ (Confidential) আখ্যা দিয়ে চেপে রাখা হত, যা এই উপাদানের একটি বড়ো সীমাবদ্ধতা।

উত্তর: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বছর দিল্লি দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ স্বয়ং বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা করেন, যা ছিল স্বদেশি আন্দোলনের অন্যতম বড়ো সাফল্য এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছে ব্রিটিশ সরকারের নতিস্বীকারের প্রতীক। একইসঙ্গে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রকে দুর্বল করা। এই দুটি ঘটনা একত্রে ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে এবং জাতীয় আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

উত্তর: এদেশে শিক্ষাবিস্তারে খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয়দের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা এবং পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ভাবধারার প্রসার ঘটিয়ে ভারতীয় সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় সংস্কার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা। এছাড়া বাংলা ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ও পাঠ্যপুস্তক রচনার মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল, যার ফলে পরোক্ষভাবে বাংলা গদ্যসাহিত্য ও মুদ্রণশিল্পের বিকাশও ঘটে।

উত্তর: “সর্বধর্ম সমন্বয়” বলতে বোঝায় বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাত না রেখে সব ধর্মের মূল সত্য, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও লক্ষ্যকে সমানভাবে স্বীকার করে এক সর্বজনীন ঐক্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা, যার মূল কথা হল “যত মত তত পথ” — অর্থাৎ সব ধর্মই ঈশ্বরলাভের বিভিন্ন পথ মাত্র। উনিশ শতকে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর নিজের জীবনে হিন্দু, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের সাধনা করে এই সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ প্রচার করেন, যা পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে।

উত্তর: “বিপ্লব” বলতে বোঝায় কোনো দেশের প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক কাঠামোকে আকস্মিক, দ্রুত ও প্রায়শই সহিংস বা সশস্ত্র উপায়ে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে তার স্থানে একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ঐতিহাসিক অর্থে বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় এক মৌলিক ও স্থায়ী পরিবর্তন ঘটায়, যেমন ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) বা রুশ বিপ্লব (১৯১৭)।

উত্তর: ফরাজি আন্দোলন মূলত ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীকালে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে তা কৃষক আন্দোলনে রূপ নেয়, কিন্তু সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ও সুসংগঠিত নেতৃত্বের অভাবে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার ও স্থানীয় জমিদারশ্রেণির যৌথ কঠোর দমননীতি এবং দুদু মিয়ার মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরসূরির অভাবে আন্দোলনটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

উত্তর: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু মেলা’-র প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে স্বাদেশিকতা ও জাতীয় গৌরববোধ জাগ্রত করে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে আত্মনির্ভরতার চেতনা তৈরি করা। এছাড়া দেশীয় শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও ক্রীড়া-চর্চাকে (যেমন কুস্তি, লাঠিখেলা) উৎসাহিত করে ভারতীয়দের শারীরিক ও মানসিকভাবে সবল করে তোলাও ছিল এই মেলার অন্যতম লক্ষ্য।

উত্তর: ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অষ্টাদশ শতকের সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে দেশমাতৃকার আরাধনা ও আত্মত্যাগের আদর্শ তুলে ধরে ভারতীয়দের মধ্যে গভীর স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা হয়। এই উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক গীত হওয়ার পর জাতীয় জাগরণের মূলমন্ত্রে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে স্বদেশি আন্দোলন ও বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

উত্তর: পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন আঠারো শতকের একজন দক্ষ বাঙালি স্বর্ণকার ও খোদাইশিল্পী, যিনি চার্লস উইলকিন্সের সহযোগী হিসেবে প্রথম বাংলা মুদ্রাক্ষর (টাইপফেস) নির্মাণ করেন এবং এইভাবে বাংলা মুদ্রণশিল্পের জনক হিসেবে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের সাথে যুক্ত হয়ে তাঁর জামাতা মনোহর কর্মকারের সহায়তায় বাংলা মুদ্রাক্ষরের আরও উন্নতি ও প্রসার ঘটান, যা বাংলা গদ্যসাহিত্য ও সংবাদপত্র প্রকাশনার ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উত্তর: স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের (National Council of Education) উদ্যোগে তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের আর্থিক সহায়তায় কলকাতায় ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশনির্ভরতা কাটিয়ে ভারতীয় যুবকদের ইংরেজি-নির্ভর প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প হিসেবে কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষায় স্বাবলম্বী করে তোলা। এর মাধ্যমে স্বদেশি শিল্পোদ্যোগের জন্য দক্ষ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করে জাতীয় অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা অর্জনই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য।

উত্তর: স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার কৃষকরা মূলত যোগ দেয়নি কারণ এই আন্দোলনে খাজনা হ্রাস, জমিদারি অত্যাচার বন্ধ বা ভূমিস্বত্ব রক্ষার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি ছিল না, ফলে তা তাদের নিত্যদিনের সমস্যার সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে হয়নি। এছাড়া আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল প্রধানত হিন্দু জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির হাতে, যাদের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদেরই ক্ষোভ ছিল, আর আন্দোলনের হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক (যেমন বন্দেমাতরম) ব্যবহারে মুসলমান কৃষকসমাজ এই আন্দোলন থেকে আরও দূরে সরে যায়। উপরন্তু বিদেশি পণ্য বর্জনের ফলে সস্তা বিদেশি লবণ, কাপড়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক দুর্ভোগও বৃদ্ধি পায়।

উত্তর: ১৯২৫-২৬ খ্রিস্টাব্দে মুজফফর আহমেদ, কুতুবউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ বামপন্থী নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একটি স্বতন্ত্র শ্রেণিসংগঠন হিসেবে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি’ গঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিতে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করে তাদের অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া (মজুরি বৃদ্ধি, খাজনা হ্রাস) আদায়ের সংগ্রামকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা। রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই দল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে।

উত্তর: স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ রুখতে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ই অক্টোবর বঙ্গীয় সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল একটি সার্কুলার জারি করেন, যা ‘কার্লাইল সার্কুলার’ নামে পরিচিত। এই সার্কুলারে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং যেসব বিদ্যালয়-কলেজ এই আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ বন্ধ করতে ব্যর্থ হবে, তাদের সরকারি অনুদান ও স্বীকৃতি বাতিল করা হবে। এর প্রতিবাদে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়, যা জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা করে।

উত্তর: হিন্দু সমাজব্যবস্থার বর্ণাশ্রম প্রথায় যেসব মানুষকে সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে স্থান দিয়ে চতুর্বর্ণের বাইরে রাখা হয়েছিল এবং যুগ যুগ ধরে অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ ও নানাবিধ সামাজিক-অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে, তাদেরই ‘দলিত’ বলা হয়। ইংরেজ আমলে এদের ‘অস্পৃশ্য’ (Untouchable) বা ‘তফসিলি জাতি’ (Scheduled Caste) নামে চিহ্নিত করা হত, এবং ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর এই দলিত শ্রেণির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

উত্তর: স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের অন্তর্ভুক্ত ৫৬২টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার জন্য সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের উদ্যোগে যে আইনগত নথি বা চুক্তিপত্র (Instrument of Accession) তৈরি করা হয়, তাকেই ‘ভারতভুক্তির দলিল’ বলা হয়। এই দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণভার ভারত সরকারের হাতে ন্যস্ত করে, যদিও অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় দেশীয় রাজারা কিছুটা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতেন।

উত্তর: স্বাধীনতার পর ভাষার ভিত্তিতে পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, বিশেষত পৃথক অন্ধ্র রাজ্যের দাবিতে পট্টি শ্রীরামুলুর অনশনে মৃত্যুর (১৯৫২) পর আন্দোলন চরম আকার ধারণ করলে, ভারত সরকার ফজল আলির সভাপতিত্বে এবং হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কে. এম. পানিক্করকে সদস্য করে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজ্যপুনর্গঠন কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সুপারিশ প্রদান করা, যার ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে রাজ্যপুনর্গঠন আইন পাস হয়।

উত্তর: উনিশ শতকে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সমাজসংস্কার প্রচেষ্টা একাধিক কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।

১) নেতৃত্বের অকালমৃত্যু: মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ডিরোজিওর মৃত্যু হলে আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে।

২) সীমাবদ্ধ সামাজিক ভিত্তি: এই গোষ্ঠী মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক ইংরেজি শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, গ্রামবাংলা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

৩) পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ: প্রকাশ্যে গোমাংস ভক্ষণ, মদ্যপান ও হিন্দুধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করায় তারা রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের কাছে ঘৃণিত হয়ে ওঠে।

৪) গঠনমূলক কর্মসূচির অভাব: তারা প্রচলিত সমাজ ও ধর্মের কঠোর সমালোচনা করলেও কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প বা গঠনমূলক সংস্কার কর্মসূচি দিতে পারেনি।

৫) সাংগঠনিক দুর্বলতা: তাদের কোনো সুসংগঠিত সংগঠন বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না, ফলে আন্দোলন ধারাবাহিকতা হারায়।

৬) রক্ষণশীল শক্তির বিরোধিতা: ধর্মসভার মতো গোঁড়া হিন্দু সংগঠনগুলি এবং সমাজের রক্ষণশীল অংশ তাদের তীব্র বিরোধিতা করে।

৭) সরকারি সমর্থনের অভাব: ব্রিটিশ সরকার ও সংবাদপত্রের একাংশও তাদের প্রতি উদাসীন বা বিরূপ মনোভাব পোষণ করত, ফলে তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায়নি।

এই সমস্ত কারণে নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সমাজসংস্কার প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

উত্তর: পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে উনিশ শতকের বাংলায় যে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, ঐতিহাসিকরা তাকে ‘বাংলার নবজাগরণ’ নামে অভিহিত করেন। কিন্তু এই জাগরণের প্রকৃতি ও বিস্তার ছিল অত্যন্ত সীমিত, তাই একে ‘সীমাবদ্ধ নবজাগরণ’ বলা হয়।

১) শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা: ঐতিহাসিক জে. এইচ. ব্রুমফিল্ডের (J.H. Broomfield) মতে, এই আন্দোলন মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

২) গ্রামবাংলা থেকে বিচ্ছিন্নতা: গ্রামবাংলার কৃষক সমাজ, মুসলিম জনগোষ্ঠী ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কাছে এই আন্দোলনের বার্তা পৌঁছায়নি।

৩) ঐতিহাসিকদের সমালোচনা: ড. অশোক মিত্র একে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বলেছেন; বিনয় ঘোষ একে ‘অতিকথা’ ও ‘ঐতিহাসিক প্রতারণা’ আখ্যা দিয়েছেন; ড. অনিল শীল একে ‘এলিটিস্ট আন্দোলন’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

৪) রাজনৈতিক আনুগত্য: নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত ছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দাবি তোলেননি।

৫) কৃষক আন্দোলনে ঔদাসীন্য: নীল বিদ্রোহ বা সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো তৎকালীন কৃষক ও আদিবাসী আন্দোলনের প্রতি তাঁরা কার্যত নীরব বা উদাসীন থেকেছেন।

৬) নারীসমাজে সীমিত প্রভাব: নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা সংক্রান্ত সংস্কার মূলত উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, ব্যাপক নারীসমাজে তা পৌঁছায়নি।

৭) ধর্মীয় সংস্কারের সংকীর্ণতা: ব্রাহ্মধর্মের মতো সংস্কার আন্দোলনও মূলত হিন্দু ভদ্রলোক সমাজেই আবদ্ধ থাকে, ব্যাপক জনগণের ধর্মীয় জীবনে তার প্রভাব পড়েনি।

তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য ও চিন্তাজগতে এই জাগরণের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না, কারণ এটি পরবর্তীকালে ব্যাপকতর সমাজ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

উত্তর: পাশ্চাত্য শিক্ষা ও উদারনৈতিক চিন্তাধারার প্রভাবে উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা জন্ম নেয়, যার ফলে একের পর এক রাজনৈতিক সভা-সমিতি গড়ে ওঠে। এই কারণে ঐতিহাসিক অনিল শীল উনিশ শতকের এই পর্বকে ‘সভা-সমিতির যুগ’ (Age of Associations) বলে অভিহিত করেছেন।

১) প্রাথমিক পর্বের সংগঠন: ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ‘জমিদার সভা’ এবং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এই ধারার সূচনা করে।

২) হিন্দুমেলা: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুমেলা জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

৩) ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন: ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন জমিদার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করে।

৪) ইন্ডিয়ান লিগ ও ভারতসভা: ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে শিশিরকুমার ঘোষের ইন্ডিয়ান লিগ এবং ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ভারতসভা অপেক্ষাকৃত ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

৫) ভৌগোলিক বিস্তার: প্রথমে বাংলায় শুরু হলেও পরবর্তীকালে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন, মাদ্রাজ মহাজন সভার মতো সংগঠন গড়ে ওঠায় এই ধারা সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।

৬) সীমাবদ্ধতা: এই সংগঠনগুলি মূলত উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সাধারণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না।

৭) ঐতিহাসিক গুরুত্ব: সরকারি নীতির বিরোধিতা, রাজনৈতিক দাবিদাওয়া উত্থাপন ও জাতীয় ঐক্য গঠনে এই সভাগুলির অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি রচনা করে।

উত্তর: ঐতিহাসিক যোগেশচন্দ্র বাগল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এর উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি ছিল স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক চরিত্রের।

১) প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট: ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে বেন্টিঙ্কের শিক্ষাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হলে দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রশ্নে বাঙালি সমাজে উদ্বেগ দেখা দেয়, এই প্রেক্ষাপটেই ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের উদ্যোগে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।

২) অরাজনৈতিক ধর্মীয় বিতর্ক থেকে বিচ্যুতি: সমকালীন আত্মীয়সভা বা ব্রাহ্মসমাজের মতো ধর্মীয় সংস্কার সংগঠন থেকে ভিন্ন পথে হেঁটে এই সভা প্রশাসনিক ও জনস্বার্থমূলক বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে আনে।

৩) রাজস্ব ও ভূমিনীতির বিরোধিতা: সরকারের করনীতি, রাজস্ব বৃদ্ধি ও ভূমি বন্দোবস্ত সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সভা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ ও আবেদনপত্র পেশ করে।

৪) বিচার বিভাগীয় সংস্কারের দাবি: বিচারব্যবস্থার ত্রুটি ও ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সভা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করে।

৫) সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত গঠন: সভার সদস্যরা সংবাদপত্র ও পত্রিকার মাধ্যমে জনমত সংগঠিত করে সরকারের নীতির যৌক্তিক সমালোচনা করতেন।

৬) শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ: আবেদন-নিবেদনের (Prayer-Petition) মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশের যে ধারা পরবর্তীকালে জমিদার সভা, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও কংগ্রেসের রাজনীতিতে দেখা যায়, তার সূচনা এই সভার হাত ধরেই হয়।

৭) ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রশাসনিক নীতির সমালোচনা ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়া উত্থাপনের এই ধারাবাহিকতার জন্যই এটি ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

উত্তর: আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকে বাংলায় ছাপাখানা ও ছাপা বইয়ের প্রসারের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড় ও পারস্পরিক নির্ভরশীল।

১) শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের ভূমিকা: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ডের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশন প্রেস বাংলা মুদ্রণ ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনার সূচনা করে।

২) ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে দেশীয় পণ্ডিতরা বাংলা গদ্যে পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন, যা আধুনিক বাংলা গদ্যরীতির ভিত্তি স্থাপন করে।

৩) প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যবই: ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ প্রকাশিত হয়ে শিশুশিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

৪) স্কুল বুক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের জন্য সুলভে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের ব্যবস্থা করে।

৫) মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ: ছাপা বইয়ের সহজলভ্যতার ফলে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের সুযোগ পায়, যা শিক্ষার সামাজিক ভিত্তি প্রসারিত করে।

৬) সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থের মুদ্রণ: কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত প্রভৃতি ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটায়।

৭) সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের ভূমিকা: ‘সমাচার দর্পণ’, ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর মতো সংবাদপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও সচেতনতা গড়ে তোলে।

৮) সামগ্রিক প্রভাব: এই সমস্ত উদ্যোগের ফলে জ্ঞানচর্চা কয়েকজন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং আধুনিক শিক্ষার সুদৃঢ় ভিত্তি রচিত হয়।

উত্তর: উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলার মুদ্রণ শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন শিশুসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী ও বিজ্ঞানসাধক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ)।

১) ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা: তিনি নিজস্ব প্রচেষ্টায় একটি মুদ্রণালয় গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কলকাতার এক অগ্রণী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

২) হাফটোন ব্লক প্রযুক্তির প্রবর্তন: তৎকালীন প্রচলিত এনগ্রেভিং পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা দূর করে তিনি রঙিন ও হাফটোন ব্লক মুদ্রণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা ভারতীয় মুদ্রণ প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

৩) স্বদেশি প্রযুক্তির উদ্ভাবন: সম্পূর্ণ দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে গবেষণার মাধ্যমে তিনি ডায়াফর্ম যন্ত্র, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র এবং ডুয়োটাইপ ও টিন্ট প্রসেস পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

৪) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্রের নামকরণ হয় ‘রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার’ এবং পদ্ধতিটির নাম হয় ‘রে-টিন্ট প্রসেস’, যা তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ।

৫) বিলেতে বাণিজ্যিক প্রয়োগ: তাঁর পরিকল্পনা ও নকশা অনুসরণ করে ব্রিটেনে বাণিজ্যিকভাবে স্ক্রিন অ্যাডজাস্টিং মেশিন তৈরি হয়, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি এনে দেয়।

৬) সাহিত্য-মুদ্রণে সমন্বয়: একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী ও মুদ্রণ-বিশেষজ্ঞ হওয়ায় তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকা ও নিজের রচিত শিশুসাহিত্য গ্রন্থগুলিতে উন্নত ছবি ও রঙিন মুদ্রণের প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা শিশুসাহিত্যের মানোন্নয়ন ঘটান।

৭) উত্তরসূরিদের হাতে ধারাবাহিকতা: তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ ঐতিহ্য পরবর্তীকালে পুত্র সুকুমার রায় ও পৌত্র সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে আরও সমৃদ্ধ হয়।

উপসংহারে বলা যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাংলা তথা ভারতীয় মুদ্রণ শিল্পকে বিশ্বমানের সঙ্গে সংযুক্ত করে, যা তাঁকে বাংলা মুদ্রণ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে তোলে।

উত্তর: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হলে যে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে বাংলার ছাত্রসমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১) স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনে অংশগ্রহণ: ছাত্ররা বিদেশি পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্যের প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নেয় এবং শহর-গ্রামে ঘুরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে।

২) জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন: ব্রিটিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন করে ছাত্ররা জাতীয় শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার হয়, যার ফলশ্রুতিতে ১৯০৬ সালে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ ও বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩) প্রতিবাদ সভা ও মিছিল: ছাত্রসমাজ বিভিন্ন প্রতিবাদ সভা, মিছিল ও পিকেটিং কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

৪) বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যোগদান: অরবিন্দ ঘোষ ও বারীন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ‘অনুশীলন সমিতি’ ও ‘যুগান্তর’ দলে বহু ছাত্র যোগ দেয়; ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার প্রচেষ্টা চালান।

৫) আত্মত্যাগ ও দমন-পীড়ন: ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমননীতির ফলে বহু ছাত্র গ্রেফতার, বহিষ্কার ও ফাঁসির শাস্তির শিকার হন।

এই ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের চাপে অবশেষে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়, এবং এই আন্দোলনই পরবর্তী জাতীয় আন্দোলনগুলিতে ছাত্রসমাজের সক্রিয় ভূমিকার ভিত্তি রচনা করে।

উত্তর: মহারাষ্ট্রের মাহার সম্প্রদায়ভুক্ত এক অস্পৃশ্য পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ভারতীয় দলিত আন্দোলনকে এক নতুন দিশা দেন।

১) সংগঠন গড়ে তোলা: ১৯২০-র দশক থেকে তিনি মাহার সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে দলিতদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন।

২) মহাদ সত্যাগ্রহ: ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মহাদে চৌদার জলাশয় থেকে জলগ্রহণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দলিতদের জনসাধারণের জলাশয় ও পুকুর ব্যবহারের অধিকারের দাবি তোলেন এবং একই বছর প্রতীকীভাবে মনুস্মৃতি দাহ করে ব্রাহ্মণ্যবাদী বৈষম্যের প্রতিবাদ জানান।

৩) মন্দিরে প্রবেশাধিকার আন্দোলন: ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কালারাম মন্দির প্রবেশ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে দলিতদের মন্দিরে প্রবেশাধিকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

৪) পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি ও পুনা চুক্তি: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি তুলে গান্ধিজির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ চরমে ওঠে, শেষপর্যন্ত পুনা চুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা স্থির হয়।

৫) রাজনৈতিক সংগঠন গঠন: তিনি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি এবং ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় তপশিলি জাতি ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করে দলিতদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।

৬) সংবিধান রচনা ও আইনি সংস্কার: স্বাধীনতার পর সংবিধান রচনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি সংবিধানে অস্পৃশ্যতা নিবারণ ও সংরক্ষণের বিধান যুক্ত করেন এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এভাবে ড. আম্বেদকর তাত্ত্বিক আন্দোলন থেকে শুরু করে সাংবিধানিক সংস্কার পর্যন্ত দলিত আন্দোলনকে এক সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ক+রেন।

উত্তর:

ভূমিকা:
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হলেও এর প্রকৃত চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকমহলে আজও তীব্র মতবিরোধ বিদ্যমান। এই বিদ্রোহকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছেন, যা মূলত চারটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত করা যায়।

১. সিপাহি বিদ্রোহ তত্ত্ব:
স্যার জন লরেন্স, স্যার জন সিলি এবং চার্লস রেকস-এর মতো সমসাময়িক ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের মতে, এটি নিছক সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষজনিত এক সামরিক বিদ্রোহ (‘Sepoy Mutiny’) মাত্র। এনফিল্ড রাইফেলের গুলিতে গোরু ও শুকরের চর্বি মেশানোর গুজবকে তাঁরা বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ বলে মনে করেন এবং এর মধ্যে কোনো সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা খুঁজে পাননি।

২. জাতীয় বিদ্রোহ/স্বাধীনতা সংগ্রাম তত্ত্ব:
এর বিপরীতে বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Indian War of Independence 1857”-এ একে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সিপাহি, কৃষক, তাঁতি ও দেশীয় রাজন্যবর্গের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং ব্রিটিশবিরোধী অভিন্ন লক্ষ্য এই আন্দোলনকে নিছক সেনাবিদ্রোহের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল। কার্ল মার্কসও একে ইউরোপীয়দের ভুল ধারণার বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে একটি জাতীয় বিদ্রোহ বলে বর্ণনা করেন।

৩. সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব:
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর “The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857” গ্রন্থে এই মতের বিরোধিতা করে বলেন যে, এটি ছিল মূলত ক্ষমতাচ্যুত সামন্তপ্রভু, তালুকদার ও দেশীয় রাজন্যবর্গের স্বার্থরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন, যাঁরা ব্রিটিশ ভূমিরাজস্ব নীতি ও রাজ্যগ্রাস নীতির (Doctrine of Lapse) ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরাতন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে এতে জাতীয় ঐক্যের প্রকৃত চেতনা অনুপস্থিত ছিল।

৪. গণবিদ্রোহ/জনযুদ্ধ তত্ত্ব:
ঐতিহাসিক এস. এন. সেন তাঁর “Eighteen Fifty Seven” গ্রন্থে দেখান যে সূচনা সেনাবিদ্রোহ হলেও অচিরেই তা অযোধ্যা, বুন্দেলখণ্ড ও রোহিলখণ্ডের কৃষক, তাঁতি ও নিম্নবর্গের ব্যাপক অংশগ্রহণে এক গণবিদ্রোহে রূপান্তরিত হয়। এরিক স্টোকস তাঁর “The Peasant Armed” গ্রন্থে এই কৃষক-অংশগ্রহণের দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।

সামগ্রিক মূল্যায়ন:
বিদ্রোহের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি (মিরাট থেকে দিল্লি, লখনউ, কানপুর, ঝাঁসি পর্যন্ত), হিন্দু-মুসলমান ঐক্য, বাহাদুর শাহকে সম্রাট ঘোষণা করে একটি বিকল্প কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, এবং দমননীতিতে ব্রিটিশ সরকারের সর্বাত্মক সামরিক শক্তি প্রয়োগ প্রমাণ করে যে এটি নিছক সামরিক বিদ্রোহের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে এতে সুসংগঠিত পরিকল্পনা, অভিন্ন নেতৃত্ব বা স্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের অভাব ছিল, এবং বহু অঞ্চল (বাংলা, মাদ্রাজ, বোম্বাই প্রেসিডেন্সি) এর বাইরেই থেকে যায়। তাই ঐতিহাসিক সি. এ. বেইলি যথার্থই বলেছেন যে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল একক কোনো আন্দোলন নয়, বরং বিভিন্ন শ্রেণি, স্বার্থ ও অঞ্চলের বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধের এক জটিল সমন্বয়

উপসংহার:
সুতরাং বলা যায়, ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে কোনো একটিমাত্র তত্ত্বের কাঠামোয় বেঁধে ফেলা যায় না। এতে সামরিক অসন্তোষ, সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থ, ধর্মীয় ভীতি ও প্রাক-জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ চেতনার এক জটিল মিশ্রণ ঘটেছিল, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উত্তর:

ভূমিকা:
ঊনবিংশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে যেসব বিদেশি হিতৈষী ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে ডেভিড হেয়ার ও ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ারের ভূমিকা—

১. স্কটল্যান্ডের অধিবাসী পেশায় ঘড়ি-ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ার ছিলেন এদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম প্রধান রূপকার।

২. রাজা রামমোহন রায়ের সহযোগিতায় তিনি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৩. এই কলেজ থেকেই পরবর্তীকালে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর নেতৃত্বে ‘ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন’-এর উদ্ভব ঘটে।

৪. সাধারণ মানুষের শিক্ষাবিস্তারে তিনি পটলডাঙা অ্যাকাডেমি (পরবর্তীতে হেয়ার স্কুল) সহ একাধিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি এবং ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে সহজবোধ্য পাঠ্যপুস্তক রচনা ও বিতরণের ব্যবস্থা হয়।

৬. দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি বহু ছাত্রকে শিক্ষালাভে উদ্বুদ্ধ করেন।

৭. ১৮৪৫ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আজীবন অকৃতদার ডেভিড হেয়ার শিক্ষাবিস্তারের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করেছিলেন বলে তাঁকে বাংলার নবজাগরণের ‘নীরব রূপকার’ বলা হয়।

এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের ভূমিকা— 

১. জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন ছিলেন গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের আইন সদস্য ও শিক্ষা পরিষদের সভাপতি, যিনি নারীশিক্ষা প্রসারকে সমাজ-অগ্রগতির পূর্বশর্ত মনে করতেন।

২. পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সক্রিয় সহযোগিতায় তিনি ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ভারতে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রথম বালিকা বিদ্যালয়।

৩. এই বিদ্যালয়ই পরবর্তীকালে বেথুন স্কুল এবং ১৮৭৯ সালে বেথুন কলেজে উন্নীত হয়।

৪. রক্ষণশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি অবিচলভাবে এই উদ্যোগ চালিয়ে যান, যার ফলে বাংলায় নারীশিক্ষার নতুন যুগের সূচনা ঘটে।

উপসংহার:
ডেভিড হেয়ার যেখানে পুরুষশিক্ষার আধুনিক ভিত্তি রচনা করেন, সেখানে বেথুন নারীশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে সেই কাঠামোকে সামগ্রিকতা দান করেন। এই দুই বিদেশি হিতৈষীর প্রচেষ্টাতেই ঊনবিংশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের বলিষ্ঠ ভিত্তি গড়ে ওঠে।

উত্তর:

ভূমিকা:
বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে বাবা রামচন্দ্র এক উল্লেখযোগ্য নাম, যাঁর নেতৃত্বে অযোধ্যা অঞ্চলে সংগঠিত হয় বিখ্যাত ‘একা আন্দোলন’।

১. প্রকৃতপক্ষে মহারাষ্ট্রের অধিবাসী বাবা রামচন্দ্র ফিজিতে (তদানীন্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ) গিরমিটিয়া শ্রমিক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) অযোধ্যা (প্রতাপগড়, রায়বেরিলি, সুলতানপুর) অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন।

২. তিনি তালুকদার ও জমিদারদের নজরানা, বেগার (অবৈতনিক শ্রম) ও অবৈধ উচ্চহারে খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।

৩. রামায়ণ ও তুলসীদাসের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ধর্মীয়-নৈতিক ভাষায় কৃষকদের মধ্যে ঐক্যবোধ ও শোষণবিরোধী চেতনা জাগ্রত করার কৌশল নেন, যা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

একা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

১. ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন কিষান সভা আন্দোলন ব্যর্থ হলে অসন্তুষ্ট কিছু স্থানীয় নেতা মদারি পাসি-র নেতৃত্বে হরদই, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বাহরাইচ অঞ্চলে ‘একা আন্দোলন’ (Eka Movement বা Unity Movement) শুরু করেন।

২. আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল— নগদের পরিবর্তে উৎপন্ন ফসলের ভিত্তিতে খাজনা নির্ধারণ, খাজনার রসিদ প্রদান, এবং বেগার প্রথা ও জমি থেকে বেআইনি উৎখাতের অবসান।

৩. এই আন্দোলনে কৃষকরা এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে— গঙ্গাজল স্পর্শ করে বা পবিত্র গ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিত যে তারা অন্যায্য খাজনা দেবে না ও জমিদারদের অত্যাচার প্রতিরোধ করবে, যা আন্দোলনকে ধর্মীয়-নৈতিক শক্তি জোগায়।

৪. আন্দোলনটি ছিল মূলত অহিংস ও শান্তিপূর্ণ চরিত্রের, তবে ক্রমে এটি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং সহিংসতার আশঙ্কায় গান্ধীজি ও কংগ্রেস নেতৃত্ব এই আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখেন।

৫. ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ব্রিটিশ প্রশাসনের কঠোর দমননীতি ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ফলে আন্দোলনটি স্তিমিত হয়ে পড়ে, তবে এটি যুক্তপ্রদেশের কৃষকশ্রেণির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

উপসংহার:
বাবা রামচন্দ্রের প্রাথমিক উদ্যোগ ও তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত একা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় কৃষকসমাজ কেবল জাতীয় আন্দোলনের অনুসারী ছিল না, বরং তাদের নিজস্ব শ্রেণিস্বার্থে স্বতন্ত্র ও সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতাও অর্জন করেছিল।




Share This Awesome Post 😊

Leave a Comment